Assertion For Justice, Equality And Freedom.

Monday, April 28, 2014

নারী মানবাধিকার কর্মীদের সুরক্ষায় প্রস্তাব পাস

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মানবাধিকারবিষয়ক কমিটিতে গত বুধবার রাতে নারী মানবাধিকারকর্মীদের রক্ষায় একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে। ভ্যাটিকান সিটি, ইরান, চীন, রাশিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশের বিরোধিতা সত্ত্বেও প্রস্তাবটি পাস হয়। ওই প্রস্তাবে নারী মানবাধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধে যেকোনো সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে নিন্দা জানাতে প্রতিটি দেশের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে জাতিসংঘের যেকোনো সংস্থায় নারী মানবাধিকারকর্মীদের অবাধ প্রবেশ নিশ্চিত করতে আইন সংশোধনেরও আহ্বান জানানো হয়েছে।

নরওয়ের নেতৃত্বে মানবাধিকারবিষয়ক কমিটি কয়েক মাস ধরে ওই প্রস্তাব তৈরি করে। আফ্রিকা ও মুসলিম বিশ্বের কয়েকটি দেশসহ ভ্যাটিকান সিটি, ইরান, রাশিয়া ও চীন প্রস্তাবের বিরোধিতা করলেও শেষ পর্যন্ত তা পাস হয়। বিরোধিতাকারীরা দেশের ঐতিহ্য ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে মানবাধিকারকর্মীদের অধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

প্রস্তাব পাসের পর নরওয়ে সরকারের পক্ষের প্রধান আলোচক গিয়ার এসজোবার্গ বলেন, ‘এই প্রস্তাব পাসের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি সুস্পষ্ট বার্তা পাঠানো হলো। ওই বার্তা হলো নারী মানবাধিকারকর্মীদের বিরু"ে কোনো অপরাধ একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।’ 





এএফপি।

Tuesday, March 4, 2014

নারী উন্নয়ন নীতিমালার প্রেক্ষাপট


নারী উন্নয়ন নীতিমালা ২০১১ প্রণয়নের প্রেক্ষাপট ও এর বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জগুলো জানা দরকার। প্রথম জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি তৈরি হয়েছিল ১৯৯৭ সালে। এটা হঠাৎ করে হয়নি। এর জন্য দাবি-দাওয়া যেমন ছিল, তেমন আলোচনা ও পর্যবেক্ষণও ছিল নানারকম। সরকার এ নীতিমালা তৈরির আগে নারী সংগঠনগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেছে। সংবিধানে নারীর সমঅধিকার সংক্রান্ত ধারাগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে। বেইজিং প্লাটফর্ম ফর অ্যাকশনে নারীর জন্য যেসব কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার ব্যাপারে অঙ্গীকার করেছিল সরকার সেসব আলোচনায় ছিল। 
এছাড়া ১৯৭৯ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত ‘কনভেনশন অন দ্য এলিমিনেশন অব অল ফর্মস অব ডিসক্রিমিনেশন অ্যাগেইনস্ট উওম্যান’ বা সংক্ষেপে সিডও সনদ (বাংলা অর্থ হচ্ছে- নারীর প্রতি সকলপ্রকার বৈষম্য বিলোপ সংক্রান্ত সনদ)-এ সাক্ষরের মাধ্যমে নারীর উন্নয়নের পথের বাধাগুলো দূর করতে অঙ্গীকার করেছিল বাংলাদেশ। নীতিমালা প্রণয়নের সময় সেটিও আলোচনা-পর্যালোচনায় ছিল।

অর্থাৎ নানা পক্ষের সঙ্গে ঐকমত্যের ভিত্তিতে, সংবিধানের আলোকে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হয়। নারীর অবস্থার উন্নয়নে জাতিসংঘের বিভিন্ন সম্মেলন বা সনদের মাধ্যমে গৃহীত যেসব অঙ্গীকারে বাংলাদেশ সাক্ষর করেছে বা অংশ নিয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা থেকে সরকার একটি নীতিমালা গ্রহণ করেছিল। 

বাংলাদেশে ইতোপূর্বে বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনায় নারী উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচি ও কার্যক্রম গ্রহণ করা হলেও তা ছিল বিচ্ছিন্ন ও সমন্বয়হীন৷ ১ঌঌ৫ সালে বেইজিং সম্মেলনে নারী উন্নয়ন কর্মপরিকল্পনায় নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে যে ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করা হয়েছিল যা সংক্ষেপে পিএফএ (প্লাটফর্ম ফর অ্যাকশন) নামে পরিচিত, তার আলোকে প্রথমবারের মতো একটি নারী উন্নয়ন নীতি ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা দরকার ছিল৷ যার প্রধান লক্ষ্য নির্যাতিত ও অবহেলিত এ দেশের বৃহত্তম নারীসমাজের ভাগ্য উন্নয়ন করা৷ এ নীতিমালা প্রণয়নের মধ্য দিয়ে নারীর প্রতি হাজার বছরের শোষণ ও বৈষম্য বিলোপ হবে, নারী সমঅধিকার লাভ করবে এ ছিল সবার আশা৷ নারী নীতিটি ১৯৯৭ সালের ৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবসে ঘোষিত হয়৷ 




ফওজিয়া মোসলেম
Source: bdnews24.com

Wednesday, February 12, 2014

তোমরাই বাংলাদেশের বাতিঘর - নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রয়াস কর্মসূচি ‘জয়িতা’

http://upload.wikimedia.org/wikipedia/commons/7/76/Begum_Rokeya.jpg২০ নারী বললেন তাঁদের সংগ্রামী জীবনের কথা। কেউ বা স্কুলে যাওয়ার পথে যৌন হয়রানির শিকার হয়ে প্রতিবাদমুখর হয়েছিলেন; কেউ বা শিক্ষিত স্বামীর কাছ থেকে ‘অসুন্দর ও অশিক্ষিত’ তকমা পেয়ে স্বামী-বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রতিজ্ঞায় অটল থেকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছিলেন। যৌতুকের কারণে স্বামীর নির্যাতনের শিকার হয়ে বাড়িছাড়া এক নারী পরিশ্রম করে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। প্রতিদিন মদ খেয়ে মাতলামি করে বউ-পেটানো স্বামীর অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করে এক নারী গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন এলাকার সব কটি মাদকের আস্তানা। গতকাল বুধবার সিলেট বিভাগীয় ‘জয়িতার অন্বেষণে বাংলাদেশ’ অনুষ্ঠানে সিলেট বিভাগের চার জেলার নানা প্রান্তের ২০ জন নারী নিজেদের জীবনের এ রকম বাস্তব গল্প শোনালেন। প্রতিটি গল্পই ছিল বেদনাবিধুর এক দুঃখগাথা। এ সবই সমাজে শত প্রতিকূলতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নারীর টিকে থাকার প্রত্যয়ী গল্প। গত ২৫ জানুয়ারি থেকে পর্যায়ক্রমে দেশের সাত বিভাগে এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর। সিলেট বিভাগীয় প্রশাসনের উদ্যোগে সকাল সাড়ে ১০টায় সিলেট সার্কিট হাউস মাঠে মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়। কর্মসূচির মিডিয়া পার্টনার প্রথম আলো, চ্যানেল আই ও রেডিও ভূমি। ২০ জন নারীর মধ্যে সেরা পাঁচজনকে ‘জয়িতা’ হিসেবে বেছে নেওয়া হয়।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় হতদরিদ্র রাখাল শুক্লবৈদ্যের বাড়িতে হানা দেয় পাকিস্তানি বাহিনী। তাঁকেসহ ওই বাড়ির ২১ জনকে হত্যা করে। আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয় ঘরবাড়ি। রাখালের স্ত্রী পুষ্প রানী বৈদ্যও রেহাই পাননি। পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। তাঁর বাড়ি হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার গোছাবাড়া গ্রামে। পুষ্প রানী ভেঙে পড়েননি। দুই শিশু ছেলেকে বুকে আগলে জীবনসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। অপরিসীম শ্রমে টাকা উপার্জন করে দুই ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়ে বিদেশে পাঠিয়েছেন। ‘নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যোমে জীবন শুরু করা নারী’ ক্যাটাগরিতে তিনি ‘জয়িতা’র স্বীকৃতি পেয়েছেন। তাঁর মতো আরও চারজন ‘জয়িতা’ হিসেবে সম্মান পেয়েছেন। ‘ অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জনকারী নারী’ ক্যাটাগরিতে দেলোয়ারা খাতুন, ‘শিক্ষা ও চাকরিক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী’ ক্যাটাগরিতে মিনা রানী সরকার, ‘সফল জননী নারী’ ক্যাটাগরিতে সুফিয়া আক্তার খানম এবং ‘সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন যে নারী’ ক্যাটাগরিতে সালমা বাছিত সিলেট বিভাগের সেরা ‘জয়িতা’র স্বীকৃতি আদায় করে নেন। সেরা জয়িতাদের প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা, ক্রেস্ট ও সনদ দেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে মনোনীত সব জয়িতাকেও সনদ ও ক্রেস্ট দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানের সভাপতি সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার এন এম জিয়াউল আলম বলেন, ‘জনসংখ্যার অর্ধেক নারীকে পেছনে রেখে দেশ ও সমাজ সামনে এগোতে পারে না। সম্প্রতি একটি সমাজ নারীদের পেছনে টেনে নিতে চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সেই অশুভ চেষ্টা সফল হয়নি।’ অনুষ্ঠানে বিচারক হিসেবে ছিলেন সিলেটের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মো. শামসুল ইসলাম চৌধুরী, মদনমোহন কলেজের অধ্যক্ষ আবুল ফতেহ ফাত্তাহ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক তাহমিনা ইসলাম এবং জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সিলেট বিভাগীয় সভাপতি সৈয়দা শিরিনা আক্তার। প্যানেলিস্ট ছিলেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মুহাম্মদ ইশফাকুল হোসেন, মহিলা পরিষদ সুনামগঞ্জের সভানেত্রী শীলা রায় ও জাতীয় মহিলা সংস্থা মৌলভীবাজারের চেয়ারম্যান জহুরা আলাউদ্দিন। অনুষ্ঠানে জয়িতাদের জীবনসংগ্রাম নিয়ে তৈরি করা বেশ কয়েকটি প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হয়। অনুষ্ঠানের সব শেষে ছিল সিলেটের ঐতিহ্যবাহী ধামাইল ও মণিপুরী নৃত্য পরিবেশনা।






তথ্যসুত্রঃ প্রথম আলো, বাংলাদেশ।

Saturday, July 27, 2013

কেশব রায়, ভাঙারির দোকান থেকে বিশ্ব আসরে - শিশু অধিকার, শিশুবিবাহ বন্ধ, স্যানিটেশন, গর্ভবতী মায়েদের সেবা, ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিলেন। হয়ে উঠলেন জলঢাকা উপজেলা ও রংধনু শিশু ফোরামের সভাপতি।

স্কুলের নাম বিন্যাকুড়ি বিসি সরকারি দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয়। নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলায় এই স্কুল। সকালবেলা সার বেঁধে যে ছাত্রছাত্রীরা স্কুলে যায়, কেশব রায় ছিলেন তাঁদের মধ্যে একজন। বাবা অজিন্দ্র বর্মণ দিনমজুর, মা রঞ্জিতা রায় গৃহিণী। এলাকার শিশু সংগঠনের সক্রিয় সদস্য ছিলেন কেশব, নাটক-গানে নিয়মিতই অংশ নিতেন। অভাবের সংসার, তবু ভালোই কাটছিল দিন। হুট করেই বাবা অসুস্থ হলেন। চিকিৎসার জন্য টাকা দরকার। ছোট ভাই রঞ্জিত রায়সহ চারজনের সংসারে ভাত জোটানোই কঠিন। কেশব বাবার বড় ছেলে। ক্লাস সিক্স পেরোনো ছোট মানুষটাকেই তাই নিতে হলো বড় দায়িত্ব। সহপাঠী বন্ধুরা যখন ক্লাস সেভেনের নতুন বই-খাতা কাঁধে নিয়ে স্কুলে যেতে শুরু করল, কেশবের কাজ শুরু হলো ভাঙারির দোকানে। মাসে ৩০০ টাকা মজুরি। স্কুলের পাশেই দোকান। স্কুল শুরু আর ছুটির সময় দোকানের দরজা বন্ধ রাখতেন কেশব; বন্ধুদের সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে যাওয়ার ভয়ে, লজ্জায়!  


নীলফামারীর কেশব রায় তখনো জানতেন না, একদিন বিশ্বজোড়া নাম হবে তাঁর। যে মানুষটার ‘এডুকেশনের’ পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তিনিই পাবেন জাতিসংঘের ‘ইয়ুথ কারেজ অ্যাওয়ার্ড ফর এডুকেশন’! ইয়ুথ কারেজ অ্যাওয়ার্ড ফর এডুকেশনের জন্য সারা বিশ্ব থেকে সাতজনকে বাছাই করেছিল জাতিসংঘ। তাঁদের মধ্যে একজন আমাদের কেশব রায়। কেমন করে কেশব এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলেন, জানতে আমরা চোখ বোলাই কেশবের কাছে জাতিসংঘের শিক্ষাবিষয়ক বিশেষ দূত ও সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউনের লেখা চিঠিতে। তিনি লিখেছেন, ‘প্রতিটি ছেলেমেয়ের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে তুমি অবদান রেখেছ। এর স্বীকৃতিস্বরূপ আমরা তোমাকে তরুণদের জন্য অনুসরণীয় একজন নেতা হিসেবে মনোনীত করেছি। তোমাকে অভিনন্দন।’ কেশব এখন জলঢাকা বিএমআই কলেজের উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। প্ল্যান বাংলাদেশের একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে তিনি এসেছিলেন সাভারের বিসিডিএম (ব্র্যাক সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট) কার্যালয়ে। ভাঙারির দোকান থেকে জাতিসংঘের পুরস্কার অবধি পুরো গল্পটা শুনতে আমরা হাজির হই সেখানে। লাজুক লাজুক মুখ করে এক সদ্য কৈশোর পেরোনো তরুণ আমাদের সামনে এসে দাঁড়ান। দেখলে বিশ্বাসই হতে চায় না, এই মানুষটা প্রায় ২৫টি বাল্যবিবাহ রোধ আর ৫০টি ঝরে পড়া শিশুকে স্কুলমুখী করতে অবদান রেখেছেন। 


জলঢাকার শিশুদের কেশবদা
‘ভাঙারির দোকানে কাজ করছিলাম এক বছর। বাবার শরীরটা একটু ভালো হওয়ার পর আমাদের শিশু সংগঠনের সভাপতি কাঞ্চন রায়কে বললাম, “আপনি বাবা-মারে একটু বোঝান, আমি আবার স্কুলে যাইতে চাই।” কাঞ্চনদা কথা বললেন। বাবা মা-রাজি হইল। শেষ মাসের বেতন পেয়ে ১৫০ টাকা দিয়ে স্কুলে ভর্তি হইলাম, আর ১৫০ টাকা দিয়ে বই-খাতা কিনলাম।’ বলছিলেন কেশব। শুরু হলো আবার কেশবের স্কুলজীবন। প্ল্যান বাংলাদেশের জলঢাকা উপজেলার শিশুদলের সঙ্গে কেশব নিয়মিত কাজ করতে শুরু করলেন। শিশু অধিকার, শিশুবিবাহ বন্ধ, স্যানিটেশন, গর্ভবতী মায়েদের সেবা, ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিলেন। হয়ে উঠলেন জলঢাকা উপজেলা ও রংধনু শিশু ফোরামের সভাপতি।  এলাকার বঞ্চিত শিশুদের পাশে দাঁড়াতে শুরু করলেন কেশব। পাশাপাশি চলল বাল্যবিবাহ বন্ধের তৎপরতা। 

গল্পের এক ফাঁকে কেশব বললেন মনুফার ঘটনা: ‘২০১২ সালের কথা। এলাকার স্কুলে নবম শ্রেণীতে পড়ত মনুফা। আমাদের শিশুদলের সদস্য জুলেখা আক্তার আইসা জানাইল, মনুফার নাকি বিয়ে। আমরা ভাবলাম, একটা কিছু করা দরকার। কয়েকজন মিলে গেলাম মনুফার বাবা আবদুল মান্নান চাচার কাছে। তিনি খুব রাগ হইলেন। আমরা বোঝাইলাম। অল্প বয়সে মা হওয়ার ঝুঁকির কথা বললাম, পড়ালেখার প্রয়োজন বোঝাইলাম। চাচা কিছুতেই মানেন না। শেষে আমরা গ্রাম উন্নয়ন কমিটির মেম্বার আর আমাদের উপজেলার চেয়ারম্যানকে সঙ্গে নিয়ে মনুফার বাবার সঙ্গে দেখা করলাম। তাঁরা বোঝাইলেন, আইনের কথা বললেন। শেষে চাচা বুঝলেন। মনুফা এখন দশম শ্রেণীতে পড়ে, ভালো ছাত্রী সে। আমারে প্রায়ই বলে, “দাদা, আপনার জন্যই পড়ালেখাটা করতে পারতেছি।”’ এ রকম আরও কত ঘটনা কেশবের ভান্ডারে! প্রদেশ চন্দ্র রায় ক্লাস ফাইভে পড়ে। হঠাৎ করেই একদিন বাবা পাগালু চন্দ্র রায় তার পড়ালেখা বন্ধ করে কাজে লাগিয়ে দিলেন। খবর পেয়ে কেশব গেলেন পাগালু চন্দ্র রায়ের সঙ্গে দেখা করতে। বললেন, ‘আপনি কি চান বড় হয়ে আপনার ছেলে আপনার মতো ভ্যানচালক হোক?’ প্রদেশ চন্দ্রের বাবা মাথা নাড়েন, তিনি চান না। কিন্তু তাঁর কোনো উপায়ও নেই, একার আয়ে সংসার চলে না। কেশব ব্যাপারটা বুঝলেন। কিন্তু প্রদেশ চন্দ্রের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে, সেটাও মানতে পারছিলেন না। ছোট্ট ছেলেটার ভেতরে যে কষ্ট-লজ্জা কাজ করছিল, সেটা কেশবের চেয়ে ভালো কে জানে! বুদ্ধি করে কেশব প্রদেশ চন্দ্রকে সিএমইএসে (সেন্টার ফর ম্যাস এডুকেশন ইন সায়েন্স) ভর্তি করে দিলেন। দরজির কাজের পাশাপাশি এখন চলছে প্রদেশ চন্দ্রের পড়ালেখা। প্রদেশ খুশি, বাবা পাগালু চন্দ্রও  খুশি!


 প্রথম দিকে মানুষের কটু কথা, বকাঝকা শুনতে হলেও এখন বেশ সচেতন হয়েছে জলঢাকা উপজেলার মানুষ। কেশব বলছিলেন, ‘আগে সমস্যা হইত। বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে গেলে মেয়ের বাবা-মায়েরা বলত, “তুই বিয়ে বন্ধ করতে আসছিস, পরে কি তুই বিয়ের ব্যবস্থা করবি?” এখন এলাকার লোকজন সাহায্য করে। বোঝে, আমরা ভালো কাজ করি।’ সম্মাননা গ্রহণ করতে নিউইয়র্ক যাওয়া হয়নি কেশবের। তাঁর পক্ষে পুরস্কার গ্রহণ করেছেন প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের নিউইয়র্ক প্রতিনিধি। তবে এরই মধ্যে বিলেত ভ্রমণ হয়ে গেছে তাঁর। শ্রীলঙ্কায় ‘শিশুর সুরক্ষায় শিশুদের অংশগ্রহণ’ বিষয়ক সেমিনার ও সমাবেশে, আর থাইল্যান্ডের শিশু সম্মেলনে প্ল্যানের পক্ষ থেকে অংশ নিয়েছেন কেশব। পড়ালেখা চলছে, সামাজিক কর্মকাণ্ডও চলছে নিয়মিত। তাই বলে ভাববেন না, রাতারাতি কেশবদের দিন বদলে গেছে। দিনমজুরের ছেলে, লাজুক তরুণটি কথায় কথায় জানালেন, ‘আমি পড়ালেখার পাশাপাশি কাজও করি। কয়েক দিন আগে শিলাবৃষ্টিতে ঘরের খুব ক্ষতি হইল। বাবার টাকা দরকার। আমি গেছি বগুড়া, ছোট ভাই গেছে চট্টগ্রামে। দুজন সেইখানে খেতখামারে কাজ করছি। আমি ছয় হাজার, আর ছোট ভাই চার হাজার টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরছি। বাবার হাতে তুলে দিছি। বাবা-মায়ের কষ্টটা বুঝি। ওই দিকটাও তো দেখতে হবে।’





Source: Doinik Prothom alo



 
Our Another Site : Right Way BD | Right Way BD FB Group | Right Way BD FB Page |