Assertion For Justice, Equality And Freedom.

Wednesday, March 26, 2014

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও গণমাধ্যমের ভূমিকা

১৯ মার্চ ২০১৪, প্রথম আলোর আয়োজনে ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সহযোগিতায় ছিল কম্প্রিহেনসিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম (সিডিএমপি-২)। অনুষ্ঠানে উপস্থিত আলোচকদের বক্তব্য সংক্ষিপ্ত আকারে প্রকাশিত হলো।
 
আলোচনা
১ দুর্যোগ-পূর্ব প্রস্তুতিতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে
২. দুর্যোগ বিষয়ে গণমাধ্যম অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করতে পারে
৩. ত্রাণ কার্যক্রমের পাশাপাশি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দিতে হবে
৪. দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সাফল্যের দৃষ্টান্ত গণমাধ্যমে প্রচার করা
৫. দুর্যোগের আগে থেকেই সচেতনতামূলক প্রচার চালানো
৬. জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকির সংবাদ প্রচার করা।

যাঁরা অংশ নিলেন

মেছবাহ উল আলম               : সচিব, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়
মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুম     : অতিরিক্ত সচিব, জাতীয় প্রকল্প পরিচালক, সিডিএমপি
এ এস এম মাকসুদ কামাল : চেয়ারম্যান, ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগ ও ডিন, ফ্যাকাল্টি অব এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স, ঢাবি
রিয়াজউদ্দিন আহমেদ            :   সম্পাদক, দ্য নিউজ টুডে
মতিউর রহমান চৌধুরী          :   সম্পাদক, মানবজমিন
সৈয়দ বদরুল আহসান             : নির্বাহী সম্পাদক, দ্য ডেইলি স্টার
মাহবুবা নাসরীন             : পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ, ঢাবি
আফসানা হক                          : সহকারী অধ্যাপক, আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগ, বুুয়েট
এ এইচ এম বজলুর রহমান   : প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন
মো. সামছুর রহমান                 : পরিচালক প্রশাসন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর
পিটার মিডওয়ে                        : প্রজেক্ট ম্যানেজার, সিডিএমপি
আবদুল লতিফ খান                   : ডিজাস্টার রেসপনস ম্যানেজমেন্ট বিশেষজ্ঞ, সিডিএমপি
সঞ্চালক
আব্দুল কাইয়ুম, সহযোগী সম্পাদক, প্রথম আলো।

আব্দুল কাইয়ুম: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ এখন মডেল। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও দেশের মানুষ—সবার প্রচেষ্টায় এটা সম্ভব হয়েছে। এখানে গণমাধ্যমের ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে দুর্যোগের আগে মানুষের মধ্যে সতর্কবার্তা ও করণীয় সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। ২০০৭ সালের সিডরে এক বাড়িতে দেখলাম ১৮ জনের মধ্যে ১০ জন বেঁচে গেছেন। তাঁরা একটি পাকা বাথরুমে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাহলে প্রতি বাড়িতে যদি একটি করে ছোট পাকা ঘর থাকে, সেটাও মানুষকে দুর্যোগের সময় রক্ষা করতে পারে। এসব বিষয়ে গণমাধ্যম অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করতে পারে। প্রথম আলো সিডরের ওপর লেখা ও ছবি নিয়ে একটি প্রামাণ্য বই প্রকাশ করেছে। এটা ভবিষ্যতে গবেষণায় কাজে লাগবে। গণমাধ্যম এ ধরনের আরও অনেক কিছু করতে পারে। এখন আলোচনা করবেন মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুম।

মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুম: আমাদের দেশ ঝুঁকিপ্রবণ। ঝুঁকির দিক থেকে বাংলাদেশের স্থান বিশ্বে পঞ্চম। দেশের সব অঞ্চল কোনো না কোনো ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। দুর্যোগে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বলতে কেবল ত্রাণ তৎপরতাকে বোঝানো হতো। আশির দশকের পর থেকে এ ধারণার পরিবর্তন হয়েছে। বেশি জনসংখ্যার ঘনত্বের জন্য ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। ছোট একটি ভূখণ্ডে ১৬ কোটি মানুষের বাস। বাধ্য হয়ে মানুষ উপকূল, শহরের বস্তিসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বাস করে। যথেষ্ট অর্থনৈতিক সক্ষমতা থাকলে দ্রুত ঝুঁকি মোকাবিলা করতে সহজ হতো। বঙ্গোপসাগর ও হিমালয়ের মাঝখানে আমরা আছি। সাগরের পানি কিছুটা বৃদ্ধি পেলে দক্ষিণাঞ্চলের নদীগুলোর লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায়। উন্নয়ন নীতিতে দীর্ঘমেয়াদি সুবিধার কথা ভাবতে হবে। কেবল স্বল্পমেয়াদি সুবিধার কথা ভাবা হয়। ফলে অনেক সময় সুবিধার লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে না। ১৯৯৮ সালে বন্যার স্থায়িত্ব ছিল ৬৮ দিন।
বাংলাদেশের রাস্তাগুলো পানি চলাচলের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ হচ্ছে। গ্রাম থেকে বেশি পরিমাণে মানুষ শহরে আসছে। দুটোই জীবনের ঝুঁকি তৈরি করছে। এখন ৩০ শতাংশ মানুষ শহরে বাস করে। ২০৫০ সালের আগেই ৫০ শতাংশ মানুষ শহরে বাস করবে। এ ক্ষেত্রে আগুন, ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড় যেকোনো ধরনের দুর্যোগে ব্যাপক প্রাণহানি হবে। সাইক্লোন মোকাবিলায় কিছুটা অগ্রগতি হলেও বন্যা মোকাবিলায় যথেষ্ট অগ্রগতি হয়নি। দুর্যোগের একটি বড় কারণ হচ্ছে আবহাওয়ার পরিবর্তন। আমাদের খাদ্যের প্রধান উৎস কৃষি। আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে কৃষি, পশুপালন, মৎস্য চাষ—সবকিছুর ব্যাপক ক্ষতি হবে। ফলে বেকার সমস্যা তীব্রতর হবে। তীব্র লবণাক্ততার জন্য এক হাজার কিলোমিটার উপকূলীয় অঞ্চলে ভয়াবহ পানিসংকট তৈরি হয়েছে। এ অঞ্চলের কৃষি, পশুপালন, মাছ চাষ সবকিছু বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। শহরে ভবনধস ও অগ্নিকাণ্ডের পরিমাণ বাড়ছে। অবস্থানগত কারণে পানি আমাদের সমস্যায় ফেলছে।
বেশি পানি, কম পানি, অসময়ে পানি—সবই সমস্যা তৈরি করছে। ১৯৭১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের মোট ৪৪০টি দুর্যোগ হয়। এতে দেশের ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি হয়। মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৫৪০ কোটি ৩৮ লাখ ২ হাজার মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ।প্রাণহানি হয় দুই লাখ ৪৩ হাজার ৮৪ জনের। দুর্যোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কের বিষয় হলো ভূমিকম্প। ৭ মাত্রার বেশি তীব্র ভূমিকম্প হলে বড় শহরগুলোতে ব্যাপক মানুষের মৃত্যু ও ভবনধস হবে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে না ভাবলে বিপর্যয়ে পড়ব, যা থেকে উদ্ধার পাওয়া কষ্টকর হবে।

রিয়াজউদ্দিন আহমেদ: ১৯৭০ সালের সাইক্লোনের ঘটনা কভার করেছি। আমেরিকা থেকে জাহাজ এসেছিল। সিঙ্গাপুর থেকে প্লেন এসে কেরোসিনের ড্রাম, রিলিফ নিচে ফেলে দিত। এখন সে অবস্থা নেই। দুর্যোগ মোকাবিলা করতে করতে দেশের মানুষ জীবন থেকে অনেক কিছু শিখেছে। ষাট-সত্তরের দশকের মতো এখন আর মানুষ মারা যায় না। এখন কোনো দুর্যোগ আসার আগে প্রায় সবাই জানতে পারে। এসব ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা রয়েছে। দুর্যোগের সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাংবাদিকেরা উপকূলের সংবাদ পাঠান। ফলে মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি জানতে পারে। ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আমরা দুর্বল অবস্থায় আছি।
এ জন্য অনেক কিছু জানার পরও ঠিকভাবে জীবন ও সম্পদ রক্ষা করতে পারছি না। শহরের রাস্তায় খোলা তারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সঞ্চালনে প্রচণ্ড অব্যবস্থাপনা রয়েছে। ভূমিকম্পের ফলে অগ্নিকাণ্ড হবে। এতে জীবন ও সম্পদের হয়তো ৯০ শতাংশ ধ্বংস হবে। বারবার এসব বিষয় বলছি। আমার জানামতে, কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হয়েছে। একটা ভবনধস হলে সব প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রায় এক মাস লাগে সেটা ঠিক করতে। আর ভূমিকম্পে ঢাকায় যদি এক লাখ ভবন ধ্বংস হয়, তাহলে অবস্থা কী হবে? দুর্যোগের সময় কোথায় সাহায্য দরকার, কোথায় রিলিফের অনিয়ম হচ্ছে, গণমাধ্যম সবই তুলে ধরছে। কোনো বিষয়ে দ্বিমত হলে ছবি দেখিয়ে প্রমাণ করা হচ্ছে। গণমাধ্যম অনেক বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছে। এবং কিছু কাজও হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বংলাদেশ একটা মডেল। আগামী দিনে গণমাধ্যম এ ক্ষেত্রে আরও বেশি কাজ করবে।

মাহবুবা নাসরীন: ১৯৮৭ ও ১৯৮৮ সালে পরপর দুবার বাংলাদেশে বন্যা হয়। তখন আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি আলোচনায় আসে। আমি ১৯৮৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিই। এ সময় টাইম ম্যাগাজিন-এ একটি ছবি ছাপানো হয়। মানুষ গলাপানিতে দাঁড়িয়ে সাহায্যের জন্য অপেক্ষা করছে। একজন তাদের কবিতা পড়ে শোনাচ্ছেন। তখন মনে হলো আমরা সমাজবিজ্ঞানীরা কী করছি। তাই রুটি বানানোসহ বিভিন্ন কাজ শুরু করলাম। আমার কমনওয়েলথ বৃত্তিতে দুর্যোগে মানুষ কীভাবে বেঁচে থাকে—এ বিষয় নিয়ে গবেষণা করি। গবেষণার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা ছিল না। গণমাধ্যমের খবরই ছিল প্রধান উৎস।
১৯৯৩ সালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ব্যুরো হলো। তখন ফ্লাড অ্যাকশন প্ল্যানসহ কিছু কাজ শুরু হলো। আমার গবেষণায় সাহায্য করেছে বাংলাদেশের মানুষ। অত্যধিক গরম, শীত, মঙ্গা ইত্যাদিকে দুর্যোগ বলা হবে কি না এসব বিষয়ে মতবিরোধ রয়েছে। গণমাধ্যম এ ক্ষেত্রে কাজ করতে পারে। আমাদের প্রবণতা হলো দুর্যোগ হলেই কাজ করব। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা হলো প্রতিনিয়ত কাজ করার একটা বিষয়। ২০০৪ সালের পর থেকে বাংলাদেশ রিলিফ থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছে। কম্প্রিহেনসিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম কাজ করছে। মন্ত্রণালয় তৈরি হলো। ১৯৯৭ সালে স্ট্যান্ডিং অর্ডার অন ডিজাস্টার তৈরি হয়েছে। এর ফলে দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ মডেল হয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে গণমাধ্যমে আলোচনা হয়নি। কিছু মানুষ আর্সেনিক লবণাক্ততাসহ বিভিন্ন দুর্যোগের মধ্যে আছে। তাদের জন্য গণমাধ্যম কাজ করতে পারে। নীতিমালা প্রণয়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে গণমাধ্যম ভূমিকা রাখতে পারে। আহ্বান করব গণমাধ্যম যেন সারা বছর এ ক্ষেত্রে কাজ করে।

মো. সামছুর রহমান: ২৭ মার্চ দুর্যোগ প্রস্তুতি দিবস পালন করব। অক্টোবরে আমাদের দুর্যোগের বিষয় নিয়ে কর্মসূচি রয়েছে। পত্রপত্রিকায় ঘোষণা যায়। অনেক সময় সংবাদ সম্মেলন করি। গণমাধ্যমের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকেরা অনুষ্ঠানে আসেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, পরের দিন পত্রিকা দেখে হতাশ হই। আমাদের খবর পাওয়া যায় না। বিষয়টি আমাদের ভাবিয়ে তোলে। কী করলে গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যাবে। তখন সচিব মহোদয় বললেন, ওনাদের কাছে যাই। ওনারাই বলবেন কী করলে গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যাবে।
আমরা খুব বেশি বলতে চাই না। গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের কাছ থেকে শুনতে চাই, কী করলে আমাদের খবর বেশি বেশি গণমাধ্যমে আসবে। মাঠপর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। দেশে প্রতিবছর বন্যা হয়। দরিদ্র ও অল্পশিক্ষিত মানুষগুলো অভিজ্ঞতা থেকে অনেক কিছু শিখে গেছে। তাদের বেশি কিছু বলতে হয় না। সমস্যা হচ্ছে শিক্ষিত মানুষদের নিয়ে। তাঁরা বেশি জানেন। আমাদের কথা শুনতে চান না। তর্ক-বিতর্ক করেন। এ জন্য আমরা শহরের দুর্যোগ সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে পারি না। দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের সাফল্য অর্জিত হয়েছে। অনেকের কাছে রোল মডেল হয়েছি। এর সব কৃতিত্ব শিক্ষাবঞ্চিত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর। দেশে পারাপারের নৌকাগুলোতে বেশি যাত্রী ওঠে। ফলে অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে। নারায়ণগঞ্জ বন্দর ও শহরে যোগাযোগের জন্য প্রতিদিন আসা-যাওয়া মিলে প্রায় এক লাখ লোক পারাপার হয়। নিয়ম করলাম কোনো নৌকায় ছয়জনের বেশি উঠবে না। কিন্তু দেখা গেল সবাই হুড়মুড় করে উঠে পড়ে। মানুষ তার জীবনের ঝুঁকির ব্যাপারে সচেতন নয়। এসব ক্ষেত্রে গণমাধ্যম এগিয়ে এলে জনগণের উপকার হয়। তাই গণমাধ্যমকে অনুরোধ করব তারা যেন আরও বেশি বেশি সহযোগিতা করে।

এ এইচ এম বজলুর রহমান: এ ধরনের অনুষ্ঠান নিয়মিত হওয়া দরকার। তাহলে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে। আমরা দেখতে চেয়েছিলাম দুর্যোগের ক্ষেত্রে কমিউনিটি রেডিও কীভাবে কাজ করে। উপকূলীয় অঞ্চলে এখন ছয়টি কমিউনিটি রেডিও কাজ করছে। ২০১৩ সালে মহাসেন হয়েছিল। মহাসেনে কমিউনিটি রেডিওর কার্যকারিতা লক্ষ করেছি। দুর্যোগে উপকূলীয় অঞ্চল বিদ্যুৎবিহীন ছিল। আধুনিক প্রযুক্তি কাজ করছিল না। একনাগাড়ে ৫১৪ ঘণ্টা কমিউনিটি রেডিও কাজ করেছে। তাই নীতিনির্ধারকদের বলব নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে পুরোনো প্রযুক্তিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। ক্যাটরিনায় আমেরিকাও একই ভুল করেছিল। ক্যাটরিনার ভয়াবহতায় আধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগাতে পারেনি। তখন তারা পুরোনো প্রযুক্তি ফিরিয়ে আনে। এ বিষয়ে বেশি করে আলোচনা হওয়া দরকার। তাহলে অনেক বিষয় বেরিয়ে আসবে। উপকূলীয় অঞ্চলে সিপিপি (সাইক্লোন প্রিপিয়ার্ডনেস প্রোগ্রাম) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এখান থেকে গণমাধ্যম অনেক তথ্য পেয়ে থাকে। সিপিপি আরও বেশি কার্যকর রাখার ব্যাপারে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।

আফসানা হক: দুর্যোগের সময় গণমাধ্যম যথেষ্ট কাজ করে। তাদের প্রচারের ফলে বিদেশেও জনমত তৈরি হয়। প্রচুর সাহায্য আসে। কিন্তু দুর্যোগ-পূর্ব সময়েও গণমাধ্যম জনমত তৈরি করতে পারে। মানুষকে সচেতন করতে পারে। প্রচলিত গণমাধ্যম ছাড়াও বিলবোর্ড, লিফলেট, পোস্টার—এগুলোও গণমাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পরে। স্থানীয়ভাবে বিএনএনআরসি ভালো করে। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের গণমাধ্যম দুটোর মধ্যে সমন্বয় আনতে হবে। দুভাবে দুর্যোগ আসছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ। মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। দেশের জলাশয় ভরাট হচ্ছে। ফলে শহর ও গ্রামের মানুষ দীর্ঘ সময় পানিতে আবদ্ধ থাকছে। যেখানে সেখানে ভবন তৈরি হচ্ছে। ভবন তৈরিতে জাতীয় ভবন বিধিমালা মানা হচ্ছে না। ভবনধসে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।
বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের অসতর্কতাসহ বিভিন্ন কারণে প্রতিবছর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যম আগে থেকেই মানুষকে সচেতন করতে পারে। এসব নিয়ে তাদের ব্যাপক কাজ করার সুযোগ রয়েছে। সরকার ও নীতিনির্ধারণী মহলকে জানাতে পারে। তাদের কোথায় ঘাটতি রয়েছে, কী করণীয় আছে। সারা বছর গণমাধ্যম এসব নিয়ে কাজ করতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক আমার এক শিক্ষিকাকে বলছিলেন, তুমি দেশে গিয়ে কি গাছে থাকবে? তোমার দেশ তো বন্যায় ভেসে গেছে। ফলে কোনো বিষয় এমনভাবে উপস্থাপন করা যাবে না, যাতে সম্পূর্ণ নেতিবাচক ধারণা বিশ্বের কাছে যায়। গুজব-আতঙ্কের ক্ষেত্রেও মিডিয়া ভূমিকা রাখতে পারে। চূড়ান্তভাবে বলতে চাই, যাঁরা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় কাজ করবেন, তাঁদের যেন এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ থাকে। তাহলে নিজের নিরাপত্তা হবে। কাজটিও ভালো হবে। তাদের কাজ নিয়ে পরবর্তী সময়ে ফলপ্রসূ ডকুমেন্টেশন করা যাবে।

এ এস এম মাকসুদ কামাল: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দিবস উপলক্ষে আজকের গোলটেবিল বৈঠক। এ আলোচনায় গণমাধ্যম সম্পৃক্ত না থাকলে আলোচনাই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা হলো দুর্যোগের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সবকিছু প্রস্তুত রাখা দ্রুত সতর্ককরণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখানে গণমাধ্যমের ভূমিকা রয়েছে। যদি নির্মাণবিধি না মেনে ভবন তৈরি করা হয়, তাহলে জেনেবুঝেই নিজের বাসস্থানকে ঝুঁকিপূর্ণ করা হলো। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় দেশ অনেক এগিয়েছে। ৫০ হাজার সিপিপি সদস্য আছে। তিন হাজার সাইক্লোন শেল্টার আছে। তবে এ অঞ্চলে পাঁচ হাজার কিলোমিটার বেড়িবাঁধ প্রস্তুত অবস্থায় নেই। গণমাধ্যম কাজ করছে। কিন্তু কোন পর্যায় পর্যন্ত করছে, তা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
দুর্যোগের সময় গণমাধ্যম ব্যাপক কাজ করে। কিন্তু দুর্যোগের আগে ও পরে সেটি আর থাকে না। বিশেষ করে মৌসুমি দুর্যোগগুলোর আগে গণমাধ্যম মানুষকে সচেতন করতে পারে। কীভাবে সাইক্লোন শেল্টারে যেতে হবে। কী কী নিতে হবে। আরও কী প্রস্তুতি দরকার ইত্যাদি। টেলিভিশনের পাশাপাশি এর মালিকদের অন্য ব্যবসা আছে। তাঁরা তাঁদের ব্যবসায়িক ও সামাজিক কার্যক্রম (সিএসআর) তহবিল এ কাজে ব্যবহার করতে পারে। 

সরকারসহ সবাইকে এ কাজে এগিয়ে আসতে হবে। সিডরের সময় গণমাধ্যমে প্রথম সাত নম্বর সতর্ক সংকেত দেওয়া হলো। তার দু-তিন ঘণ্টার মধ্যে ১০ নম্বর সতর্ক সংকেত দেওয়া হলো। মানুষ প্রস্তুত হওয়ার বেশি সময় পায়নি। টেলিভিশন স্ক্রলে বিপত্সংকেত ও গান একই সঙ্গে যায়। ফলে মানুষ বিপদকে তেমন গুরুত্ব দেয় না। কোন পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠান পরিবেশন কী হবে, এটা গণমাধ্যমকে ভাবতে হবে। ঢাকা শহরে কিন্ডারগার্টেনসহ দুই হাজার ৭০০-এর বেশি স্কুলের মধ্যে অনেক নামীদামি স্কুলও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে রয়েছে। দুর্যোগের ওপর জাতিসংঘ এক গবেষণা করেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় এক ডলার খরচ করলে রিলিফসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে ১০ ডলার ব্যয় কমে আসবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বাজেটের বড় অংশ ব্যয় হয় রিলিফের জন্য। রিলিফ থেকে বেরিয়ে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য অনেক বেশি ব্যয় করতে হবে। প্রথম আলো সিডরের ওপর ডকুমেন্টেশন করেছে। এমন ডকুমেন্টেশন আরও করতে হবে।

সৈয়দ বদরুল আহসান: আমরা সংবাদপত্রে কাজ করি। মনে করি, সব জানি। আজ এখানে এসে অনেক কিছু জানা হলো। জনগণকে সচেতন উদ্বুদ্ধকরণের কথা বলা হয়েছে। সাংবাদিকদেরও আরও সচেতন হতে হবে। টেলিভিশনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কেবল রাজনীতির বিষয়ে আলোচনা হয়। অনেককে বলেছি কেন এত আওয়ামী লীগ-বিএনপির কথা বলা হয়। তাঁদের ব্যবস্থাপনা নাকি এটাই চায়। এর বাইরে আরও সামাজিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা করতে হবে।
কয়েক বছর আগে আমরা গুরুত্বের সঙ্গে নদী বাঁচাও আন্দোলন করেছিলাম। এখন এ বিষয়ে কথা শোনা যায় না। রাজনৈতিক দল ক্ষমতার বাইরে থাকলে গণমাধ্যমের বন্ধু হয়। ক্ষমতায় গেলে গণমাধ্যমকে চেনে না। আমাদের কথা শোনে না। বিলবোর্ডে অনেক রকমের বিজ্ঞাপন দেখি। দুর্যোগের বিষয় এখানে তুলে ধরা যেতে পারে। তাহলে মানুষের মধ্যে সচেতনতা আরও বাড়বে। সাংবাদিকদের সব বিষয়ে লিখতে বলি। কোনো বিশেষ বিষয়ে দক্ষতা থাকে না। দুর্যোগের বিষয়ে কাজ করার জন্য সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন আছে। দুর্যোগসহ বেশি করে অন্য সামাজিক বিষয়গুলো টক শোতে আনতে হবে। আমি মনে করি, গণমাধ্যমকে আরও বেশি কাজ করতে হবে।

মতিউর রহমান চৌধুরী: আমরা সবাই গণমাধ্যমের সহযোগিতা চাই। কিন্তু মিডিয়ার অবস্থান কোথায়, সেটা বুঝতে হবে। দুর্যোগ মোকাবিলায় জাতীয় কমিটি আছে। এ কমিটিতে কি গণমাধ্যমের কোনো প্রতিনিধি আছেন? কোনোকালে ছিল? ছিল না। গণমাধ্যমকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তাহলে তাদের কাছ থেকে কতটুকু আশা করতে পারেন? টক শোতে রাজনীতি নিয়ে বেশি আলোচনা হয়। কারণ কী? রাজনীতিবিদেরা অনেক বিষয়ে কথা বলেন। এর মধ্যে রাজনীতি নিয়ে কথা বললে এটাই হেডলাইন হয়। টেলিভিশনের স্ক্রলে এটাই দেখা যায়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দিবসে প্রধানমন্ত্রী অনেক কথা বলবেন।
যেই রাজনীতি নিয়ে দুটো লাইন বলবেন, এটাকে সবাই হেডলাইন করবেন। মূল বিষয়টি মানুষের মধ্যে আলোচনায় আসবে না। আলোচনাগুলো যে জায়গার বিষয়, সেখানে হওয়া উচিত। বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর কোথাও ইলেকট্রিক তার রাস্তার ওপর নেই। ইলেকট্রিক লাইনকে অবশ্যই মটির নিচে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। দুর্ভাগ্য হচ্ছে, মাটির নিচে তার নেওয়ার জন্য কয়েকবার টাকা এসেছে। এ টাকা নয়ছয় হয়েছে। গণমাধ্যমে এ খবর দিলে হয়তো মামলা হবে। ভয়ংকর সিডরের সময় গণমাধ্যমে গান বেজেছে। এটা ঠিক নয়। অনেক সময় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় থাকে না। অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, এদের কাছ থেকে সহযোগিতা পাওয়া যায় না। টেলিভিশনকে যেতে দেওয়া হয় না। বলে সেনসেটিভ। কিসের সেনসেটিভ? বিদেশি পত্রিকাগুলো সহযোগিতা পাচ্ছে। আমরা পাচ্ছি না। যাঁরা দুই লাইন লেখেন না, তাঁরা বিদেশে সম্মেলনগুলোতে যান। অথবা এমন একজনকে নেওয়া হলো, যিনি সাত দিন পর বদলি হলেন অন্য কোথাও। তাঁর অভিজ্ঞতা কোনো কাজে লাগল না। এসব বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে। মসজিদভিত্তিক ক্যাম্পেইন হতে পারে। সবার সঙ্গে একমত, দুর্যোগের আগে-পরে গণমাধ্যমের কাজ করা প্রয়োজন।

মেছবাহ উল আলম: দুর্যোগ মন্ত্রণালয় ও গণমাধ্যম মানুষের জন্য কাজ করছে। এখানে কোনো রাজনীতি নেই। দুর্যোগ সবার জন্য। ঝড় এলে বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর মানুষকে ক্ষতি করবে, অন্যরা বেঁচে যাবে তা নয়। দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের মডেল মনে করা হয়। কিন্তু সব ধরনের দুর্যোগ নয়। কেবল ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় মডেল। ১৯৭০ সালের ঝড়ের কথাই আলোচনায় আসে। ষোলো শ-সতেরো শ সালেও এ রকম বড় ঝড় হয়েছে। একটি বইয়ে পড়েছি, ইংরেজ বাহাদুর ঝড় দেখতে গিয়ে গাছে লাশ দেখেছেন। ১৯৭০ সালের পর থেকে আমরা রিলিফনির্ভর ছিলাম। এখন বেরিয়ে আসছি। বিভিন্নভাবে ঝুঁকি মোকাবিলার দক্ষতা বাড়াতে হবে। এখানে সবার ভূমিকা আছে।
মহাসেনে খুব বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। ব্যাপক লোককে উদ্ধার করতে পেরেছি। সম্পদ বাঁচাতে পেরেছি। গণমাধ্যমসহ সবার সহযোগিতায় এটা হয়েছে। যেকোনো দুর্যোগের ক্ষেত্রে আগে থেকেই প্রচার-প্রচারণা চালানো উচিত। জাতি হিসেবে আমরা অত্যন্ত ভালো। প্রতিবেশীর বিপদে দেশের মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ে। আমেরিকার একটা দলকে বললাম দুর্যোগের সময় ৫০ হাজার সদস্য বিনা পয়সায় কাজ করে। ওরা বিশ্বাস করতে পারে না, এটা কী করে সম্ভব। সবার বিবেককে জাগ্রত করতে হবে। এখানে গণমাধ্যমের ভূমিকা আছে। ছোটবেলা থেকেই রেডিওতে আবহাওয়ার সংবাদ শুনে আসছি। এখন কতটুকু গ্রহণ করছি, সেটা একটা বিষয় হতে পারে। গত বছর প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে এ বিষয়ে আলোচনা হলো। কিন্তু কোনো পত্রিকায় সে খবর পেলাম না। তখন মনে হলো সমস্যা কোথায়, ওনাদের সঙ্গে বসি। ওনারাই বলুক কী করতে হবে। সাংবাদিকেরা লেখার বিষয় খোঁজেন। এটা কি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়? সিপিপির জন্য ১৫ কোটি টাকার সরঞ্জাম দিয়েছি। তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। সিপিপি খুব ভালো অবস্থায় আছে। রানা প্লাজাধসের সময় আমাদের আরবান স্বেচ্ছাসেবকেরা চরম ঝুঁকি নিয়ে রাত-দিন কাজ করেছেন। এ কাজের যাবতীয় তহবিল দুর্যোগ মন্ত্রণালয় থেকে গেছে। কিন্তু পত্রিকায় এ খবর আসেনি। অন্তত আমাদের জন্য দুই লাইন লিখলে উত্সাহিত হই। সাংবাদিক-আমরা উভয়ই মানুষের জন্য কাজ করি। এ কাজ আরও কত ভালোভাবে করা যায়, সেটি আমাদের উভয়ের লক্ষ্য হওয়া উচিত।

অবদুল লতিফ খান: দুর্যোগ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে। সবার মধ্যে ভালো যোগাযোগ থাকলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হওয়ার সুযোগ বেশি হবে। অনেক নতুন বিষয় আছে। এগুলো মানুষের জানা দরকার। গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে সব শ্রেণী-পেশার মানুষ জানতে পারে। আগে আমরা তিন দিনের অগ্রিম বন্যার পূর্বাভাস দিতে পারতাম। এখন পাঁচ দিন আগে পূর্বাভাস দিতে পারি। এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক একটা সমীক্ষা করেছে। এ সমীক্ষায় বলা হয়েছে, তিন দিনের জায়গায় পাঁচ দিন আগে বন্যার পূর্বাভাস দেওয়ায় বাংলাদেশের জনগণের স্থানান্তরযোগ্য সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি ২০ শতাংশের বেশি রোধ করা সম্ভব হয়েছে। মিলিয়ন ডলার ক্ষতি কমে যাচ্ছে। এসব ইতিবাচক ঘটনা গণমাধ্যম প্রচার করতে পারে। তাহলে সবার মধ্যে সচেতনতা তৈরি হবে। অনেক ব্যস্ততার মধ্যেও আপনারা আজকের অনুষ্ঠানে এসেছেন, সময় দিয়েছেন। সবাইকে আমাদের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ।

পিটার মিডওয়ে: গণমাধ্যম এবং কম্প্রিহেনসিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে কাজ করতে পারে। যুক্তরাজ্যে ১৮ শ শতকে গণমাধ্যম সরকার পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। যুক্তরাজ্যে সাংবাদিকেরা দুর্যোগ নিয়ে বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করেন। এটা অনেক বেশি জনপ্রিয়। বড় দুর্যোগে অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজব্যবস্থা সবকিছুকে দুর্বল করে দেয়। তাই দুর্যোগ মোকাবিলায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। দুর্যোগে গণমাধ্যম দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করতে পারে। সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীরা দুর্যোগ মোকাবিলায় ভালো কাজ করছে। এদের সঙ্গে যদি গণমাধ্যম আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়, তাহলে বাংলাদেশ দুর্যোগ মোকাবিলায় আরও সাফল্য অর্জন করতে পারবে। আজ প্রথম আলো ও কম্প্রিহেনসিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামের উদ্যোগে যে ফলপ্রসূ আলোচনা হলো তাতে ভবিষ্যতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় গণমাধ্যমের ভূমিকা আরও অনেক বেশি বাড়বে বলে মনে করি।

আব্দুল কাইয়ুম: বারবার দুর্যোগ এসে আমাদের অর্থনীতিকে দুর্বল করে দেয়। বাংলাদেশকে আরও শক্তভাবে দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হবে। দুর্যোগ মোকাবিলায় অন্য সবার মতো গণমাধ্যমও কাজ করছে। ভবিষ্যতে গণমাধ্যমের আরও বেশি অংশগ্রহণ থাকবে বলে আশা করি। আপনাদের সবাইবে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ।




তথ্যসুত্রঃ প্রথম আলো, বংলাদেশ

ডায়াবেটিস যখন অনিয়ন্ত্রিত

ডায়াবেটিসের জটিলতা নানাবিধ। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ধীরে ধীরে কিডনি, হূদ্যন্ত্র, চোখ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ক্ষতি করে ও অকার্যকর করে দেয়। তবে হঠাৎ করে রক্তে শর্করা অনেক বেশি বেড়ে গেলে মারাত্মক জীবনাশঙ্কা দেখা দিতে পারে। এর একটি হলো ডায়াবেটিক কিটোএসিডোসিস। সাধারণত টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত শিশু-কিশোরদেরই এটি বেশি হয়। কেননা, তাদের দেহে ইনসুলিন হরমোন প্রায় থাকে না বললেই চলে।


ডায়াবেটিক কিটোএসিডোসিসে তিনটি মারাত্মক বিপর্যয় ঘটে: 
১। হাইপারগ্লাইসেমিয়া: রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়
২। চর্বি ভেঙে রক্তে কিটোন নামের অম্ল তৈরি হতে থাকে 
৩। মেটাবলিক এসিডোসিস: ক্রমে এই কিটোন দেহে জমে গিয়ে রক্তের অম্লত্ব অস্বাভাবিক বেড়ে যায় এবং বাইকার্বোনেট কমে যায়।

কীভাবে বুঝবেন: কিটোএসিডোসিস একটি আকস্মিক জরুরি অবস্থা। কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যে কিছু উপসর্গ দ্রুত বেড়ে গিয়ে এতে রোগী জ্ঞান হারিয়ে ফেলে ও কোমায় আক্রান্ত হয়। উপসর্গগুলো হলোঃ 
১। প্রস্রাবের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া
২। প্রচণ্ড তৃষ্ণা জোরে জোরে শ্বাস এবং শ্বাসে এসিটোনের গন্ধ 
৩। বমি
৪। চোখে ঝাপসা দেখা
৫। পেটে ব্যথা 
৬। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া
৭।  জ্ঞান হারিয়ে ফেলা

কেন হয়: আকস্মিকভাবে রক্তে শর্করা অনেক বেশি বেড়ে যাওয়াই এই অবস্থার কারণ। এমনটা হতে পারে যদি কেউ কয়েক দিন ইনসুলিন না নেয়, না বুঝে ইনসুলিনের ডোজ বেশি কমিয়ে দেয়, সঠিকভাবে ইনসুলিন না দেয়, জ্বর বা সংক্রমণের কারণে রক্তে শর্করা বেড়ে যায়, ডায়াবেটিক রোগীর অস্ত্রোপচার বা গর্ভাবস্থা বা প্রসবের সময় ঠিকমতো চিকিৎসা না হলে। ছোটদের টাইপ-১ ডায়াবেটিস প্রথমবারের মতো এই সমস্যা নিয়ে ধরা পড়তে পারে।

চিকিৎসা
ডায়াবেটিক কিটোএসিডোসিস একটি জরুরি অবস্থা এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করা হলে মৃত্যু অবধারিত। যত দ্রুত সম্ভব এ ধরনের রোগীকে বিশেষায়িত হাসপাতালে নিতে হবে। এই সমস্যায় দেহ প্রচণ্ড রকমের পানিশূন্য হয়ে পড়ে। তাই দ্রুত শিরায় স্যালাইনের মাধ্যমে পানিশূন্যতা পূরণ করতে হবে। হাসপাতালে শিরায় বিশেষ পদ্ধতিতে ইনসুলিন দিয়ে এর চিকিৎসা করা হয়।

প্রতিরোধ
যারা অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসে বা টাইপ-১ ডায়াবেটিসের রোগী, তারা কোনো অবস্থাতেই একদিনের জন্যও ইনসুলিন নেওয়া বন্ধ করবেন না। সাধারণ জ্বর বা রোগে হঠাৎ করে ইনসুলিনের ডোজ কমাবেন না। অনিয়ন্ত্রিত শর্করার লক্ষণ যেমন ঘন ঘন পিপাসা বা ঘন ঘন প্রস্রাব ইত্যাদি বোধ করলে দ্রুত শর্করা মাপুন ও চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। শৃঙ্খলা ও নিয়মকানুন মেনে চললে এ ধরনের সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

-অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ 
ডিন, মেডিসিন অনুষদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।





তথ্যসুত্রঃ প্রথম আলো, বংলাদেশ

Wednesday, January 15, 2014

ঘূর্ণিঝড় সিডর - ২০০৭, জীবনের প্রতীক সিডর সরকার...

২৪০ কিলোমিটার গতির ঘূর্ণিঝড়। ১৫ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাস। সাড়ে তিন হাজার মানুষের মৃত্যু। ৫৫ হাজার মানুষ আহত। ৮৫ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত।২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর রাত। কয়েক ঘণ্টার তাণ্ডবে লন্ডভন্ড বাংলাদেশের উপকূলীয় ১১ জেলা। সিডর নামের সেই ঘূর্ণিঝড় স্থলভাগে আঘাত হেনেছিল বাগেরহাটের শরণখোলার বলেশ্বর নদ দিয়ে। তারই পার্শ্ববর্তী উপজেলা মংলার চিলা ইউনিয়ন। সেই দিন বিকেলে শত মানুষের সঙ্গে জীবন বাঁচাতে আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটেছেন সাথী সরকার ও জর্জি সরকার। সাথী সরকার অন্তঃসত্ত্বা। স্থানীয় সেন্ট মেরিস গির্জাসংলগ্ন আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই হয় তাঁদের। সেই ঘোর দুর্যোগের রাতে ভোরের আলো ফোটার আগমুহূর্তে জন্ম নিল এক শিশু। ঝড়-ঝঞ্ঝাকে পরাস্ত করে টিকে থাকা উপকূলবাসীর সংগ্রামের প্রতীক হয়ে উঠল সেই শিশু। সাথী দম্পতি তার নাম রাখলেন সিডর। সিডর সরকার। দেখতে দেখতে ছয় বছর পার করে সাত বছরে পা দিয়েছে সেদিনের ছোট্ট সিডর। এ বছর শিশু শ্রেণী থেকে সব বিষয়ে এ প্লাস পেয়ে প্রথম শ্রেণীতে উঠেছে সে। তবে ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাত সয়ে পৃথিবীর মুখ দেখলেও দারিদ্র্য নামক ঝড়ের সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে  তাকে।


সিডরের দাদি রিভা সরকার (৫৫) গতকাল মঙ্গলবার আবার প্রথম আলোকে গর্ব করে বললেন, সিডর ভূমিষ্ঠ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝড় থেমে যায়। কিন্তু জীবনের ঝড় মাথায় নিয়েই সিডরকে এখনো এগিয়ে যেতে হচ্ছে। সিডরের বাবা জর্জি সরকার (৩১) ও মা সাথী সরকার (২৬) বছর দুই আগে ঢাকার একটি পোশাক কারখানায় কাজ নিয়েছেন। সিডর এখন থাকছে দাদির কাছে। সে এলাকার দিশারী শিশু শিক্ষানিকেতনে পড়ে। সাথী দম্পতি মাস শেষে যে টাকা পাঠান, তা দিয়ে চলে সংসার ও সিডরের পড়াশোনা। সিডরের দাদা রঞ্জিত সরকার সুন্দরবনে মাছ ধরেন। আয় তেমন নেই। দাদা বললেন, তিন বছর ধরে সিডর কানের যন্ত্রণায় খুব কষ্ট পাচ্ছে। টাকার অভাবে বড় ডাক্তার (বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক) দেখাতে পারছেন না।  গতকাল শেষ বিকেলে রঞ্জিতের বাড়িতে গেলে দেখা যায়, সিডর উঠানে খেলছে। বড় হয়ে কী হবে—প্রথাগত এই প্রশ্নে ছোট্ট সিডর খেলতে খেলতে উত্তর দেয়, ‘মানুষ হব।’ তারপর কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলে, ‘ফাদার হব। মানুষের সেবা করব।’

ঘুর্নিঝড়ে মানুষের ভোগান্তি, আপডেটঃ ২৩ মে, ২০১৩, প্রথম আলো : 

ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের পর সাত দিন পার হলেও বরগুনার বেশির ভাগ এলাকার জলাবদ্ধতা কমেনি। বরগুনা সদর ও তালতলীতে এখনো অনেক পরিবার পানিবন্দী। বরগুনায় এত দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা আগে কখনো হয়নি। সিডর-আইলা এবং ষাট ও সত্তরের দশকে প্রলয়ংকরী বেশ কয়েকটি ঘূর্ণিঝড়ে বিস্তীর্ণ উপকূলে ১৫-২০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হলেও ৮-১০ ঘণ্টার মধ্যে পানি নেমে যায়। কিন্তু এবারই প্রথম দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে এই এলাকার কয়েক লাখ মানুষ। এ ঘটনাকে নজিরবিহীন বলে মন্তব্য করেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে কাজ করেন এমন স্থানীয় ব্যক্তিরা। এ জন্য জেলার প্রায় ৭০০ খাল দখলের কারণে সরু হওয়া এবং সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত স্লুইসগেট ও বাঁধ মেরামত না হওয়াকে দায়ী করেন তাঁরা।

সদর উপজেলার নলটোনা ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সোবহান মৃধা বলেন, ভাটার সময় যে পানি নামে ভাঙা স্লুইসগেট ও বাঁধ দিয়ে, জোয়ারের সময় তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি পানি ওঠে। ফলে জলাবদ্ধতা কমছে না। তালতলী উপজেলার সোনাকাটা ইউনিয়নের বড় আমখোলা গ্রামের বাসিন্দা ফোরকান আকন অভিযোগ করেন, বড় আমখোলা, লাউপাড়া ও কবিরাজপাড়া—এই তিন গ্রামের মানুষ সাত দিন ধরে পানিবন্দী। বড় আমখোলা এলাকায় তিন গ্রামের পানি নিষ্কাশনের জন্য আছে একটি কালভার্ট। সেটি স্থানীয় কয়েকজন দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সেখানে মাছ ধরার জন্য ইচ্ছামতো পানি ওঠানামা করাচ্ছেন। এতে এই তিন গ্রামের প্রায় দেড় হাজার পরিবার পানিবন্দী।

রেড ক্রিসেন্টের ‘ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি’র সদর উপজেলা দলনেতা জাকির হোসেন বলেন, সিডরে জেলার বেশির ভাগ স্লুইসগেট অকেজো হয়ে গেছে। বেশির ভাগ স্লুইসগেটে জলকপাট না থাকায় পানি ওঠানামায় কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এ ছাড়া সিডর ও আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধগুলোও মেরামত হয়নি। ফলে এবার জলোচ্ছ্বাস ও প্রবল বর্ষণে জেলার ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। তিনি বলেন, যেসব প্রাকৃতিক খাল দিয়ে এসব পানি ভাটায় নেমে যাওয়ার কথা, সেসব খালের বেশির ভাগ দখলের কারণে সংকুচিত হয়ে গেছে। ফলে বৃষ্টি ও জোয়ারে যে পরিমাণ পানি লোকালয় ও ফসলি মাঠে জমে ভাটার সময় তার অর্ধেকও নামতে পারে না। এতেই জেলার বিভিন্ন এলাকায় স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বরগুনা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বরগুনা সদর, আমতলী ও পাথরঘাটার ২২৫টি স্লুইসগেট ষাটের দশকে নির্মাণের পর দীর্ঘদিন সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ না করায় এগুলোর ভিত দুর্বল হয়ে পড়েছে। সিডর ও আইলার সময় পানির প্রবল তোড়ে বরগুনা সদরের নিশানবাড়িয়া, বরইতলা, খাজুরতলা ও গুলিশাখালী; পাথরঘাটার রূপদোন, ছোনবুনিয়া, ছোট পাথরঘাটা, ঘুটাবাছা, কালমেঘা, পদ্মা, লাঠিমারা, কোড়ালিয়া, মাছেরখাল, ছৈলাতলা, বাদুরতলা, নিজলাঠিমারা ও চরদুয়ানি এবং আমতলী উপজেলার জয়ালভাঙা, তেঁতুলবাড়িয়া, কড়ইবাড়িয়া, পচাকোড়ালিয়া, আরপাঙ্গাশিয়া, ঘটখালী, হলদিয়া ও গুলিশাখালী এলাকার স্লুইসগেটগুলো অকেজো হয়ে গেছে। মহাসেনের পর এসব এলাকাই ব্যাপকভাবে জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে। পাউবো বরগুনার উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আকবর হায়দার ভূঁইয়া বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসনে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানদের রাস্তা কেটে অথবা স্লুইসগেট ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য অনুরোধ করেছি।






সুত্রঃ প্রথম আলো, বাংলাদেশ

Saturday, July 27, 2013

নবজাতক ও বাড়ন্ত শিশুর যত্ন

প্রথম সন্তানের জন্মের পর প্রসুতি মাতা নবজাতকের যত্ন ও অপ্রত্তাশিত অসুখ-বিসুখ নিয়ে অনেক সময় বিপাকে পরে থাকেন। অনেক যত্ন আর প্রতিক্ষার পর যখন মায়ের কোলে তার সবচেয়ে আদরের সন্তান এসে যায়, তখন প্রতিটা মা ই চান, তার সন্তান সব দিক দিয়ে সুস্থ থাকুক এবং স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠুক। কিন্তু অপ্রত্তাসিত পরিস্থিতি ও শিশুদের অসুখ-বিসুখ মায়েদেরকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয়। তাই মায়েদের এইসব দুশ্চিন্তা দূর করতে নবজাতক  ও বাড়ন্ত শিশুর যত্ন এবং অসুখ-বিসুখের নানান দিক নিয়ে আমাদের প্রতিবেদন :


নবজাতকের মাথার পেছনে ফোলা?

কোনো কোনো শিশুর জন্মের পর মাথার পেছনে বা পিঠের নিচের দিকে কোনো একটি অংশ অস্বাভাবিকভাবে ফুলে থাকে। এ নিয়ে অভিভাবকেরা আতঙ্কে ভোগেন ও বিপাকে পড়েন। এটি ভ্রূণের অঙ্গসংগঠনজনিত একটি স্নায়ু সমস্যা। এই ফোলা অংশের ভেতর স্নায়ু বা স্নায়ুরস থাকলে তাকে মেনিনগোসিল বলা হয়। এই সমস্যার জন্য অনেক সময় শিশুর হাত-পা নাড়াতে অসুবিধা বা প্রস্রাব-পায়খানার সমস্যাও দেখা দিতে পারে। এর সঙ্গে থাকতে পারে মাথার ভেতর পানি জমে মোটা হয়ে ওঠা বা হাইড্রোকেফালাস, বাঁকা পা বা ক্লাব ফুট ইত্যাদি জন্মগত ত্রুটি। এসব ত্রুটির কারণ বলা মুশকিল। তবে গর্ভকালীন সময় উচ্চমাত্রার জ্বর, সংক্রমণ ও নানা ধরনের ওষুধ খাওয়ার কারণে এসব ত্রুটি হতে পারে। এটি জন্মগত ত্রুটি হলেও বংশগত নয়। গর্ভাবস্থায় ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ করলে শিশুর এসব জন্মগত ত্রুটি অনেকটাই প্রতিরোধ করা যায়। এ সময় নিয়মিত ফলিক অ্যাসিড সেবন ও প্রচুর তাজা শাকসবজি খাওয়া উচিত। 
- ডা. সুদীপ্ত কুমার মুখার্জি , নিউরোসার্জারি বিভাগ, জাতীয় ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স ও হাসপাতাল।


শিশু পর্যাপ্ত পরিমাণে মায়ের বুকের দুধ পাচ্ছে কি না তা বোঝার উপায় কী?

 শিশু কাঁদলেই যে সে দুধ পাচ্ছে না এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। শিশু যদি ২৪ ঘণ্টায় ছয় বার প্রস্রাব করে তবে আপনি নিশ্চিন্ত হতে পারেন যে বাচ্চা পর্যাপ্ত বুকের দুধ পাচ্ছে। এ ছাড়া শিশু পরিতৃপ্ত থাকবে এবং ধীরে ধীরে তার ওজন বাড়তে থাকবে। তবে জন্মের পর প্রথম ১৫-২০ দিন শিশুর ওজন সাধারণত একটু কমে, তারপর বাড়তে শুরু করে। একটা জিনিস অবশ্যই লক্ষ রাখতে হবে, সেটা হলো দুধ খাওয়ার সময় সে ঠিকমতো বড় হাঁ করেছে কি না। l       
-ডা. নন্দলাল দাশ, শিশু বিভাগ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। 



ছয় মাস পরে কী খাওয়াবেন?

বয়স পেরিয়েছে ছয় মাস। শিশুর প্রধান খাবার মায়ের বুকের দুধ তো খাবেই, এ সময় থেকে অন্য খাবারও তাকে দিতে হবে। ছয় মাসের পর থেকে শিশুর প্রথম খাবার অবশ্যই শর্করা দিয়ে শুরু করা উচিত। যেমন নরম ভাত, আলু সেদ্ধ, হজমে সমস্যা না হলে ধীরে ধীরে ফল সেদ্ধ করে দেওয়াটা ভালো। যেমন: আপেল, গাজর, আঙুর, পাকা কলা, পাকা পেঁপে, সেদ্ধ মিষ্টি কুমড়া, সুজি ইত্যাদি।  

শিশুর খাবার ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে বারডেম হাসপাতালের শিশুরোগ বিভাগের প্রধান তাহমিনা বেগম বলেন, ‘শিশুকে প্রতিদিন নতুন রান্না করা খাবার খাওয়াতে হবে। ফ্রিজে রাখা বা বাসি খাবার খাওয়ানো যাবে না। শিশুর খাবার খাওয়ানোর বাটি, চামচ ও যিনি খাওয়াবেন তাঁর হাত অবশ্যই পরিষ্কার থাকতে হবে।’ শিশুকে ছয়-নয় মাস পর্যন্ত অন্য খাবার দিনে তিনবার খাওয়াতে হবে। শিশুকে নতুন খাবার দেওয়ার সময় অবশ্যই খেয়াল রাখুন, শরীরের কোথাও র‌্যাশ, বমি বা ঢেকুরের পরিমাণ বেশি হচ্ছে কি না। বাচ্চার কান্নার পরিমাণ হঠাৎ বেড়ে গেছে বা পেট ফুলেছে, প্রস্রাব-পায়খানায় পরিবর্তন অনুভব করলে সেই খাবার বন্ধ করতে হবে। অবস্থা বেগতিক মনে হলে অবশ্যই দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। ৯-১২ মাস পর্যন্ত শিশুকে খাবার দিতে হবে পাঁচ থেকে সাতবার। এই সময় সবজির খিচুড়ি দেওয়াটা খুব উপকারী। সবজি, চাল, ডাল, সয়াবিন তেলে সমস্যা না হলে মুরগির ছোট্ট এক টুকরা মাংস, কলিজা খিচুড়িতে মিশিয়ে খাওয়ান। সবজির মধ্যে আলু, মিষ্টি কুমড়া, টমেটো, গাজর, মূলা, শালগম, পেঁপে খাওয়ানো যেতে পারে। 

- ফারহানা মোবিন।

 

 শিশুর হঠাৎ জ্বর :

জ্বর কোনো রোগ নয়। এটি রোগের উপসর্গ। জ্বরের অন্যতম কারণ নানা ধরনের সংক্রমণ। শিশুদের  সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা, আমাশয় থেকে শুরু করে হাম, বসন্ত এবং আরও জটিল কোনো সংক্রমণ যেমন, নিউমোনিয়া, ম্যালেরিয়া, মেনিনজাইটিসের প্রথম লক্ষণ জ্বর। তাই জ্বরকে অবহেলা করা ঠিক নয়।

 শিশুর জ্বর হলে লক্ষ করুন:

১.   ঘাড়ে শক্তভাব, সামনে-পেছনে নড়ায় সমস্যা মস্তিষ্কের সংক্রমণ বা মেনিনজাইটিসের লক্ষণ।
২.   কাশি ও শ্বাসকষ্ট, ঘন ঘন শ্বাস, বুকের খাঁচা ভেতরে ঢুকে যাওয়া, বুকে শব্দ ইত্যাদি হতে পারে নিউমোনিয়ার লক্ষণ।
৩.   শরীরে দানা, দাগ, ফুসকুড়ি থাকলে হাম বা বসন্ত কি না, দেখে নিন। তবে ডেঙ্গু, ওষুধের প্রতিক্রিয়া বা মারাত্মক অ্যালার্জিতে ত্বকে এমন দানা থাকতে পারে।
৪.   শিশু জ্বর সত্ত্বেও স্বাভাবিক খাওয়া-দাওয়া ও আচরণ করছে কি না, খেয়াল করুন। শিশু যদি নেতিয়ে পড়ে, অর্ধচেতন দেখায়, শুষ্ক ও পানিশূন্য দেখায়, খিঁচুনি হয় বা শ্বাসকষ্ট হয়, তবে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান।বেশির ভাগ ভাইরাসজনিত জ্বর কয়েক দিনের মধ্যে সেরে যায়। সাত দিনের বেশি স্থায়ী হলে তা টাইফয়েড, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু হেমোরেজিক বা মারাত্মক অন্য রোগের জন্য হতে পারে।গা গরম হলেই জ্বর নয়। শিশুর বগলের নিচে থার্মোমিটার তিন-পাঁচ মিনিট রাখার পর দেহের তাপমাত্রা যদি ৯৯ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি পাওয়া যায়, তবে জ্বর আছে ধরে নিতে হবে।

বাড়িতে কী করবেন :

l যে বাচ্চা বুকের দুধ পান করে, তাকে বারবার বুকের দুধ দিন।
l  স্বাভাবিক তরল খাবার ও প্রচুর পানি পান করান, যাতে শরীর পানিশূন্য না হয়।
l শিশুর ওজন ও ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী প্যারাসিটামল খাওয়ান বা সাপোজিটরি ব্যবহার করুন।
l ছোট শিশুকে সর্দিকাশির সিরাপ, যাতে জ্বর কমানোর উপাদানও আছে, তা সেবন করানো উচিত নয়। এতে জ্বরের ওষুধের ‘ওভার ডোজ’ হয়ে যেতে পারে। 

l      শিশুর ঘরের তাপমাত্রা আরামদায়ক (১৮ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস) রাখুন। জানালা খুলে রাখুন, যথেষ্ট বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখুন। প্রয়োজনে ফ্যান ছেড়ে দিন। অতিরিক্ত কাপড়-চোপড় ও কাঁথা বা চাদরের প্রয়োজন নেই। বিশেষত, মাথা ঢেকে রাখবেন না, কারণ ছোট্ট শিশুদের তাপ মাথা থেকেই বেশি নির্গত হয়। জ্বর ছাড়ার জন্য তাপ নির্গত হওয়াটা জরুরি।  
- ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী, শিশুরোগ বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

 

শিশুর ডায়রিয়া সারছে না? :

শিশুদের ডায়রিয়া সাধারণত স্বল্পস্থায়ী। পানিশূন্যতা পূরণ, ঘন ঘন বুকের দুধ ও স্বাভাবিক খাবার খাওয়ানো ছাড়া আর কোনো চিকিৎসার দরকার হয় না। ৭-১০ দিনের মাথায় প্রায় সব বাচ্চা সুস্থ হয়ে ওঠে। তা ছাড়া বেশির ভাগ ডায়রিয়া ভাইরাসজনিত বলে অ্যান্টিবায়োটিকেরও প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু দুই সপ্তাহের পরও যদি ডায়রিয়া না সারে এবং শিশু গুরুতর বা মধ্যমমাত্রার পানিস্বল্পতায় ভোগে, তবে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা উচিত।

—দীর্ঘমেয়াদি ডায়রিয়ায় ভোগা শিশুর রোগের কারণ নির্ণয় করার চেষ্টা করতে হবে এবং তার প্রতিকার করতে হবে। শিশুর পানি ও অন্যান্য খাবার বিশুদ্ধ ও পরিচ্ছন্ন উপায়ে প্রস্তুত বা পরিবেশন করা হয় কি না, লক্ষ করুন।
—শিশুর ওজন কমে যাচ্ছে কি না, পানিশূন্যতায় ভুগছে কি না, লক্ষ রাখুন।
—শিশুর খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনমতো ক্যালরি, আমিষ, ভিটামিন ও খনিজ রয়েছে কি না, দেখুন। প্রয়োজনীয় পুষ্টি পেলে তার ক্ষতিগ্রস্ত আন্ত্রিক ঝিল্লির পর্দা আবার তৈরি হতে পারে এবং তার হজমশক্তির উন্নতি হয়।

—এমন খাবার বা পানীয় শিশুকে খেতে দেবেন না, যা তার হজম হয় না বা মল নরম করে।

—যেসব শিশু বুকের দুধ পান করে না, তার খাবারে গাভির দুধ বা ল্যাকটোজসমৃদ্ধ উপাদান কমিয়ে আনা দরকার। অনেক সময় শিশুর ল্যাকটোজ অসহনশীলতা থাকে ও বারবার ডায়রিয়া হয়।

—দেড় মাস থেকে ছয় মাস বয়সের মধ্যে এক মাস বিরতিতে দুই ডোজ রোটা ভাইরাস টিকা খাওয়ানো হলে তা ডায়রিয়া থেকে অনেকটাই সুরক্ষা দিতে পারে।

—ডায়রিয়া দীর্ঘমেয়াদি হলে, মলের সঙ্গে রক্ত গেলে বা ওজন দ্রুত কমতে থাকলে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

—ডায়রিয়া সেরে যাওয়ার পর ভিটামিন ও খনিজ পরিপূরক এবং জিংক ট্যাবলেট ১০ দিনের জন্য সেবন করতে হবে।
- ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী, শিশুরোগ বিভাগ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

  

 শিশুদের কত দিন পরপর কৃমির ওষুধ খাওয়ানো উচিত?  

 আমাদের দেশে দুই বছরের বেশি বয়সের শিশুদের প্রতি ছয় মাস পরপর এক ডোজ কৃমির ওষুধ খাওয়ানো উচিত। কেননা, আমাদের গ্রাম ও শহর দুই জায়গাতেই শিশুর অপুষ্টির একটি প্রধান কারণ হলো কৃমি। দুই বছরের কম বয়সে উপসর্গ থাকলে বা কৃমির উপস্থিতির প্রমাণ পেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ খাওয়াতে পারেন।   

-অধ্যাপক তাহমীনা বেগম শিশু বিভাগ, বারডেম হাসপাতাল।

 

 শিশু জন্মের পর মায়ের কোষ্ঠকাঠিন্যের চিকিৎসা কী?

 সন্তান জন্মের পর, সেটা অস্ত্রোপচার আর স্বাভাবিক প্রসবই হোক, মায়েদের খুব কোষ্ঠকাঠিন্য হয়ে থাকে। পানিশূন্যতা, কম নড়াচড়া ও নানা রকম ওষুধের প্রভাবে এটি হয়। এ থেকে অনেক হার্নিয়া, পাইলস ইত্যাদি জটিলতাও দেখা দেয়। এ সময় প্রচুর পানি ও দুধ পান করবেন। প্রচুর আঁশযুক্ত খাবার খাবেন। একটু হাঁটাচলা করবেন। প্রয়োজনে ল্যাক্সেটিভ বা সাপোজিটরি ব্যবহার করতে পারেন চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে। 
- ডা. রোনা লায়লা, স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগ বারডেম হাসপাতাল।

 

শিশুর আদরে সাবধানতা জরুরি :

ছোট্ট শিশুদের কোলে নেওয়ার বা আদর করার সময় সামান্য অসাবধানতায় হঠাৎ করে মস্তিষ্কে আঘাত লাগতে পারে। অনেক সময় বেশি ঝাঁকুনি, কোনো কিছুর সঙ্গে ধাক্কা বা আঘাত, জন্মগত মাথায় আঘাত বা অসাবধানতাবশত যে মস্তিষ্কের আঘাত ঘটে তা ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে পারে। বাড়িতে ও বিদ্যালয়ে শিশু নির্যাতনের কারণেও এ রকম আঘাত লাগতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে শেকেন বেবি সিনড্রোম বা ব্যাটার্ড বেবি সিনড্রোম। খুলির ভেতর মস্তিষ্ক একধরনের তরল বা সেরিব্রো স্পাইনাল ফ্লুইডের ভেতর ভাসমান অবস্থায় থাকে। শিশুদের মস্তিষ্ক খুবই কোমল বলে কখনো কোনো আঘাত বা ঝাঁকুনিতে খুলির হাড়ের সঙ্গে ঘষা খেয়ে সহজেই আঘাতপ্রাপ্ত হয়। এতে করে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, চোখের ভেতর বা রেটিনায় রক্তক্ষরণ, স্পাইনাল কর্ডে আঘাত বা মস্তিষ্কের ভেতর পানি জমার মতো সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। শিশুদের ঘাড়ের পেশি দুর্বল থাকায় অনেক সময় ঝাঁকুনি বা দুলুনির সময়ও এমন হতে পারে। সাধারণত দুই বছরের নিচে বয়সের শিশুরাই এ ধরনের আঘাত পায়। তবে পাঁচ বছর পর্যন্ত যেকোনো সময় এ রকম ঘটনা ঘটতে পারে। মৃদু আঘাতের ক্ষেত্রে বেশির ভাগ শিশুর বেলায় তেমন বড় কোনো সমস্যা না-ও হতে পারে। মাঝারি ও গুরুতর আঘাত পেলে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ শিশু মৃত্যুবরণ করতে পারে। রেটিনা আঘাতপ্রাপ্ত হলে চোখের ভেতর রক্তক্ষরণ হয় ও অন্ধত্ব হতে পারে। মস্তিষ্কের ভেতর রক্তক্ষরণ হলে ভেতরে চাপ বেড়ে যাওয়া ও অন্যান্য সমস্যায় শিশু শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী হতে পারে, জড়তা, খিঁচুনি, বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া ইত্যাদি সমস্যা হতে পারে। শিশুর ঘাড়, কাঁধ বা মাথা ধরে কখনোই ঝাঁকাবেন না। অতিরিক্ত কান্নাকাটি করলে তার কারণ বা অসুবিধার বিষয়টি বুঝতে চেষ্টা করুন, শিশুকে আঘাত করবেন না, ঝাঁকাবেন না বা মারধর করবেন না।

 

 শিশুর মুখে আঙুল?

মুখে আঙুল চোষা শিশুদের একটি অভ্যাস। বিজ্ঞানীরা বলছেন, শিশুরা জন্মের আগে থেকেই সাকিং রিফ্লেক্স বা চোষার প্রবণতা অর্জন করে, মুখে আঙুল চোষা সেই প্রবণতারই অংশ। তবে দুই থেকে চার বছর বয়সের মধ্যে এই প্রবণতা বা অভ্যাস আর থাকে না। তার পরও অনেক শিশু বিশেষ সময়ে মুখে আঙুল দিয়ে থাকে। এ নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তাগ্রস্ত না হয়ে বিষয়টিকে উপেক্ষা করাই ভালো। এ অভ্যাস এমনিতেই চলে যাবে। কিন্তু অভিভাবক হিসেবে জানা দরকার কখন আপনি এ নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন। এক. চার বা পাঁচ বছর বয়সের পরও অভ্যাসটি রয়ে গেলে তা শিশুর দাঁত ওঠায় সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। দুই. স্কুলগামী শিশুরা এ অভ্যাসের কারণে বন্ধুবান্ধব ও শিক্ষকের হাসাহাসি বা সমালোচনার শিকার হয় এবং মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। তিন. শিশু এ অভ্যাসের কারণে বারবার পেটের সংক্রমণে ভুগতে পারে। চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো, এ নিয়ে শিশুদের খুব বেশি সমালোচনা বা খেয়াল না করা। বকাবকি বা ধমকাধমকি না করে মৃদুভাবে মাঝেমধ্যে বুঝিয়ে বলতে পারেন। শিশু কোনো ভীতি বা দুশ্চিন্তা থেকে এটি করছে কি না, খুঁজে বের করে প্রতিকার করুন। সংক্রমণ এড়াতে শিশুর হাত সব সময় পরিষ্কার রাখুন। খুব প্রয়োজন হলে দন্ত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।

সূত্র: মায়ো ক্লিনিক।

 

শিশুদেরও ওজন স্বাভাবিক চাই :

কিন্ডারগার্টেনের যেসব শিশু এই মুহূর্তে একটু গোলগাল গোছের, তাদের দেখতে যত মিষ্টিই লাগুক পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ অষ্টম শ্রেণী পৌঁছা অবধি অন্যদের তুলনায় তারা পাঁচ গুণ বেশি মোটা হওয়ার ঝুঁকির  মধ্যে আছে। পরবর্তী সময়ে মানে কৈশোরে মোটা হওয়ার    কারণে তাদের ভবিষ্যৎ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হূদেরাগ ইত্যাদির ঝুঁকিও যাবে বেড়ে। সম্প্রতি শিকাগোতে আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশনে সম্মেলনে বিজ্ঞানীরা এ তথ্য প্রকাশ করেন। প্রায় আট হাজার শিশুর ওপর পাঁচ বছর ধরে গবেষণা করে বিজ্ঞানীরা বলছেন যে পাঁচ বছরের নিচে অর্থাৎ কিন্ডারগার্টেনে পড়ে এমন পশ্চিমা শিশুদের মধ্যে ১৪.৯ শতাংশ অতি ওজন এবং ১২.৪ শতাংশ স্থূলতায় ভুগছে। এই শিশুরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওবেসিটি বা স্থূলতার ৪৫ শতাংশ পূরণ করবে। তাঁরা আরও বলেন, মেয়েদের তুলনায় ছেলে শিশুরা অতিরিক্ত ওজন সমস্যায় ভোগে, বিশেষ করে নয় বছর বয়সের পর। সম্মেলনে প্রস্তাব করা হয় যে শিশুদের খাদ্যাভ্যাস, খেলাধুলা ও জীবনাচরণের দিকে অভিভাবকদের ছোটবেলা থেকেই সচেতন হওয়া উচিত।  
 সূত্র: আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশন।






Source: Doinik Prothom Alo

 

 






Saturday, April 27, 2013

৭০ ঘণ্টা পর উদ্ধার হওয়া সালমা বললেন, "বাইচা থাকলে কেমন লাগব বুঝতাছি না"

‘কবরের অন্ধকারের কথা হুনছি। কবরের আজাবের কথাও হুনছি। গত চার দিন নিজে তা বুঝতে পারছি। মরি যাওয়ার কোনো ভয় এখন আর নাই। কিন্তু বাইচা থাকলে কেমন লাগব বুঝতাছি না।’  সাভার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) বিছানায় শুয়ে এভাবেই নিজের অনুভূতি জানালেন মানিকগঞ্জের সালমা আক্তার। প্রায় ৭০ ঘণ্টা পর গতকাল সকাল সাতটার দিকে সালমাকে উদ্ধার করা হয় ধসে পড়া ভবনের চতুর্থ তলা থেকে। উদ্ধারের সময় তাঁর জ্ঞান ছিল না।  সিএমএইচে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে ২২ বছর বয়সী সালমার কথা হয় গতকাল দুপুর ১২টার দিকে। সালমার মতো জীবিত উদ্ধার হওয়া প্রায় ১০৭ জনের চিকিৎসা চলছে সিএমএইচে। তাঁরা ৪০ থেকে ৭৫ ঘণ্টা পর্যন্ত ধসে পড়া ভবনের অন্ধকার মৃত্যুপুরীতে আটকে ছিলেন।
 
চিকিৎসাধীন একাধিক ব্যক্তি প্রথম আলোকে তাঁদের বিভীষিকাময় সময়ের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন। বলেছেন, অন্ধকারে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে মৃত্যুর ভয়ে অস্থির হয়ে উঠতেন। সে জন্য সব সময় চোখ বন্ধ করে থাকতেন। ঘুমানোর ভান করতেন। মাঝেমধ্যে ঘুমিয়েও পড়তেন।  সালমা বলেন, মড়মড় শব্দ হওয়ার পরই সবাই জীবন বাঁচাতে সিঁড়ির দিকে দৌড় শুরু করেন। কিন্তু মুহূর্তে ছাদ মাথার ওপরে চেপে আসতে দেখে দুই পাশে থাকা মেশিনের মাঝখানে মেঝেতে বসে পড়েন তিনি। ছাদ ধসে উঁচু মেশিনে পড়ে ক্ষণিকের জন্য আটকে থাকে। পরক্ষণেই ছাদ আস্তে আস্তে নিচের দিকে নামতে নামতে একপর্যায়ে ফ্লোরের এক হাত ওপরে এসে আটকে থাকে। সেখানে তাঁর সঙ্গে বেশ কয়েকজন কর্মী ছিলেন। সালমা বলেন, অল্প একটু জায়াগায় সাত-আটজন একজনের ওপর আরেকজন শুয়ে ছিলেন। অন্ধকারে কারও মুখ দেখা যাচ্ছিল না। এ অবস্থায় একজন সহকর্মী মারা যান। মারা যাওয়ার সময় তিনি যন্ত্রণায় সালমার চুল টেনে ছিঁড়ে ফেলেন বলে জানান তিনি। চতুর্থ তলায় ছিলেন গাইবান্ধার মোমেনা বেগম। বয়স ২৩-২৪ বছর হবে। তিনি জানান, তাঁর ওপর আরও কয়েকজন পড়েছিলেন। জীবিত না মৃত কিছুই বুঝতে পারেননি। মোমেনাকেও গতকাল সকালে উদ্ধার করা হয়।
 
নাসরীন আক্তারকে উদ্ধার করা হয় গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে। তিনিও চতুর্থ তলায় ছিলেন। গতকাল দুপুরে হাসপাতালে গেলে তিনি এলোমেলো কথা বলছিলেন। কোনো কথাই শেষ করতে পারছিলেন না। হাতে, মুখে ও শরীরে আঁচড়ের চিহ্ন। ধারণা করা হচ্ছে, মেশিনের লোহা বা রডের আঁচড়ে শরীরের বিভিন্ন জায়গা কেটে-ছিঁড়ে গেছে। জানা গেল, তিনি একটি কলামের পাশে আটকে ছিলেন। তাঁর ওপর পড়ে ছিলেন কয়েকজন। নাসরীনকে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে।  নাসরীনের ভাই সিরাজুম মনির জানান, নাসরীনের স্বামী নান্নু মিয়াও ওই ভবনে কাজ করতেন। ধসে পড়ার আগে তিনি চা খেতে বের হয়ে বেঁচে যান। তাঁর দুটি সন্তান আছে।  নাসরীনের সঙ্গে উদ্ধার করা হয়েছে আরেকজনকে। তাঁর অবস্থা খুবই গুরুতর। তাঁকে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস দিয়ে রাখা হয়েছে আইসিইউতে।
 
সাভার সিএমএইচের প্রধান লেফটেনেন্ট কর্নেল শরীফ আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, নাসরীন মারাত্মক আঘাত না পেলেও তাঁর ওপর লাশ পড়ে থাকার কারণে মানসিকভাবে মারাত্মক আঘাত পেয়েছেন। উদ্ধার হওয়া অনেকের মধ্যে এমন সমস্যা দেখা যাচ্ছে। তাঁদের চিকিৎসায় মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ আনা হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া কয়েকজন মারাত্মক চাপা পড়ায় তাঁদের শরীরের ভেতরে রক্তক্ষরণ হচ্ছে।  গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সিএমএইচে আনা হয় চম্পা নামে একজনকে। তাঁকে মুখ দিয়ে শ্বাস নিতে দেখা গেছে। শ্বাস-প্রশ্বাসের সময় চোখগুলো বড় হয়ে যাচ্ছে। লাশের আশপাশে ছিলেন বলে তখনো তাঁর শরীর থেকে পচা লাশের দুর্গন্ধ বের হচ্ছিল।
 
চিকিৎসকেরা জানান, চম্পা কথা বলতে পারছেন না। অনেক কষ্টে নামটা শুধু বলতে পেরেছেন। বেলা দেড়টা পর্যন্ত সেখানে থাকা অবস্থায় আরও দুজনকে মুমূর্ষু অবস্থায় সিএমএইচে আনতে দেখা গেছে। ভবন ধসে পড়ার পর জীবিত উদ্ধার ৩৬৯ জনকে সাভার সিএমএইচে নেওয়া হয়। এর মধ্যে ১৮ জন পথে এবং দুজন চিকিৎসধীন অবস্থায় মারা যান। ৩২ জনকে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।  সিলেটের সুমিত্রা জানান, আটকে থাকা অবস্থায় তাঁর জ্ঞান ছিল। সারাক্ষণ মৃত্যু ছাড়া অন্য কিছুই ভাবতে পারেননি। উদ্ধারকর্মীরা বের করে আলোতে আনার পর তিনি অজ্ঞান হয়ে যান।
 
ফরিদপুরের রকিবুল হাসান উদ্ধার হন গতকাল বেলা ১১টার দিকে। বয়স বড়জোর ২০ হবে। তাঁকে মোটামুটি সুস্থই দেখা গেছে। তিনি জানান, তাঁর পাশে অণিমা নামে একটি মেয়ে ছিল। ভবনধসের পর মেয়েটি একটি কার্টুনের নিচে চাপা পড়েন। কার্টুন ছিঁড়ে ছিঁড়ে তাঁর মাথা বের করা হয়। দুজনকে একসঙ্গেই উদ্ধার করা হয়।  সকালে উদ্ধার হওয়া আবদুর রউফ (৪০) পুরোপুরি সুস্থ। তিনি জানান, মেশিন এবং কলামের মাঝখানে এক জায়গায় তিনি আটকে ছিলেন। প্রচণ্ড গরমের কারণে তিনি পাশে থাকা কার্টুন ছিঁড়ে নিজেকে বাতাস করতে পেরেছেন। ঘুমিয়েছেনও সময়ে সময়ে।

 
Our Another Site : Right Way BD | Right Way BD FB Group | Right Way BD FB Page |