Assertion For Justice, Equality And Freedom.

Friday, March 7, 2014

আড়ালেই থাকছে নারীর অবদান

 আ ন্ত র্জা তি ক না রী দি ব স আ জঃ

 বাংলাদেশে নারীদের গৃহস্থালির কাজের অর্থমূল্য হিসাব করা হয় না। এটা করা গেলে অর্থনীতিতে নারীর অবদান আড়ালে থেকে যেত না। উপরন্তু, জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) অনেক বেশি হতো। দেশের এক গবেষণায় এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। অন্যদিকে বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশেও একই অবস্থা বলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এক গবেষণায় বলা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের হিসাবে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। কৃষি, শিল্প, উদ্যোক্তা, অফিস-আদালতসহ সব কর্মক্ষেত্রেই নারীরা কাজ করছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১০ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে এক কোটি ৬২ লাখ নারী কর্মক্ষেত্রে রয়েছেন। ২০০৬ সালে এই সংখ্যা ছিল এক কোটি ১৩ লাখ। এর মানে, ওই চার বছরে প্রায় ৪৯ লাখ নারী শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছেন। সপ্তাহে যাঁরা এক ঘণ্টা কাজ করেন, তাঁদের নিয়ে এই হিসাব করা হয়েছে।

২০১২ সালে প্রকাশিত এই জরিপ অনুযায়ী, গৃহস্থালির কাজ করে কোনো মজুরি পান না ৯১ লাখ নারী। তাঁদের মধ্যে কেউ আছেন পরিবারের সদস্য, আবার কেউ গৃহকর্মী। আবার মজুরি দেওয়ার ক্ষেত্রেও নারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়। পুরুষের চেয়ে নারীদের কম মজুরি দেওয়া হয়। শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে আট লাখ ৪৯ হাজার নারী দিনমজুর রয়েছেন। তাঁরা পুরুষের সমান কাজ করেও মজুরি কম পান। পুরুষ দিনমজুরেরা পান গড়ে ১৮৪ টাকা, নারীরা পান ১৭০ টাকা। তবে শহরে নারী-পুরুষের মজুরির বৈষম্য কিছুটা কম। এখানে নারী-পুরুষেরা গড়ে প্রায় সমান মজুরি পান। শহরের পুরুষ দিনমজুরেরা পান ২০০ টাকা, নারীরা পান ১৯৮ টাকা। শহরে মূলত নির্মাণশ্রমিকই বেশি।

এদিকে ‘বাংলাদেশের নারীর অনুদ্ঘাটিত অবদান অনুসন্ধান: প্রতিবন্ধকতা, সম্পৃক্ততা ও সম্ভাব্যতা’ নামের গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নারীরা দৈনিক গড়ে ১৬ ঘণ্টা গৃহস্থালির কাজ করেন, যার জন্য কোনো মজুরি তাঁরা পান না। তাঁরা সব মিলিয়ে প্রতিবছর ৭৭ কোটি ১৬ ঘণ্টা কাজ করেন। এতে এ কাজের মোট অর্থমূল্য হয় ছয় হাজার ৯৮১ কোটি থেকে নয় হাজার ১০৩ কোটি ডলার। এই অর্থ যদি বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) যুক্ত করা হতো, তাহলে এর আকার দ্বিগুণেরও বেশি হতো।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণাপ্রধান ফাহমিদা খাতুন এ গবেষণা করেছেন। গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে একজন পুরুষ যে কাজ করেন, তার ৯৮ শতাংশই জিডিপিতে যুক্ত করা হচ্ছে। আর একজন নারীর মাত্র ৪৭ শতাংশ কাজের স্বীকৃতি জিডিপিতে মিলছে। এই গবেষণার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরির কাজ এখনো চলছে বলে তিনি জানিয়েছেন। বাংলাদেশে নারীর বাসাবাড়িতে রান্নাবান্না, সন্তান লালন-পালনসহ গৃহস্থালির কাজকর্মের স্বীকৃতি জিডিপিতে নেই। এই শ্রমের আর্থিক মূল্যমানও নির্ধারণ করা হয় না।
 
এমন প্রতিকূলতার মধ্যেও সুখবর হলো, পুরুষদের মধ্যে যেখানে বেকারত্বের হার বাড়ছে, সেখানে নারীদের বেকারত্বের হার কমেছে। ২০০৬ সালে যেখানে নারী বেকারের হার ছিল ৭ শতাংশ, ২০১০ সালে এসে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৮ শতাংশে। আর পুরুষের ক্ষেত্রে দশমিক ৭০ শতাংশ বেড়ে ৪ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। আবার যুবশক্তিতে তরুণীদের অংশগ্রহণও বেড়েছে। ২০০৬ সাল পর্যন্ত ৪৬ লাখ তরুণী শ্রমবাজারে ছিলেন। আর ২০১০ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮ লাখে। আলোচ্য সময়ে তরুণীদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের হার প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে তরুণ-তরুণী মিলিয়ে মোট যুবশক্তিতে রয়েছেন দুই কোটি নয় লাখ। সাধারণত ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীরাই তরুণ প্রজন্ম।

সময় ব্যবহারের দিক থেকেও পুরুষদের চেয়ে নারীরা এগিয়ে রয়েছেন। বিবিএসের সময় ব্যবহার জরিপে দেখা গেছে, কর্মজীবী একজন পুরুষ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অর্থের বিনিময়ে ছয় ঘণ্টা ৫৪ মিনিট কাজ করেন। আর নারীরা পাঁচ ঘণ্টা ১২ মিনিট কাজ করেন। তবে কর্মজীবী নারীরা বাসায় এসে পুরুষের চেয়ে তিন গুণ বেশি সময় কাজ করেন, যার শ্রমমূল্য নির্ধারণ করা হয় না। এ ক্ষেত্রে পুরুষ এক ঘণ্টা ২৪ মিনিট আর নারীরা তিন ঘণ্টা ৩৬ মিনিট ব্যয় করেন।
 
সামগ্রিক বিষয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক রুশিদান ইসলাম রহমান প্রথম আলোকে বলেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ যথেষ্ট বেড়েছে। ২০০৬ সালে হিসাব করা শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ ছিল ২৯ শতাংশ, ২০১০ সালে এসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬ শতাংশ। তবু নারীর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুরোপুরি স্বীকৃত হচ্ছে না। তাঁদের বড় অংশই কাজ করেন পারিবারিক মণ্ডলে, মজুরি পান না। রুশিদান ইসলাম মনে করেন, পুরুষদের অধিকারেই থাকে সব বিনিয়োগযোগ্য সম্পদ। পুরুষের অধিকারে থাকে জমি। ঋণও পান পুরুষেরাই। তবে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান মনে করেন, নারীর অবদান গণনায় এল কি না, সেটা বড় কথা নয়। নারীর অবদানের ফলেই অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন এসেছে। তাঁর মতে, শ্রমবাজারে প্রবেশ করে নারীরা অর্থনীতিতে তাঁদের প্রথম ধাপ অর্জন করেছেন।

বৈশ্বিক চিত্র: আইএমএফ গত সেপ্টেম্বরে ‘নারী, কর্ম ও অর্থনীতি’ শীর্ষক যে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে, তাতে বলা হয়েছে, শ্রমবাজারে নারীরা পূর্ণ কর্মদক্ষতা দেখাতে পারলে সামষ্টিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাতে করে বিশ্ব জিডিপি ২৭ শতাংশ বাড়ত। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ৫ শতাংশ, জাপানে ৯ শতাংশ, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১২ শতাংশ ও মিসরে ৩৪ শতাংশ জিডিপির আকার বাড়ত। আইএমএফ বলছে, সারা বিশ্বে ৮৬ কোটির বেশি নারী রয়েছেন, যাঁরা পুরো কর্মদক্ষতা দেখাতে পারছেন না। আশঙ্কার বিষয় হলো, দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ কমছে। ২০০৫ সালে শ্রমবাজারের ৩৮ শতাংশই ছিলেন নারী। আর ২০১০ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩২ শতাংশে। আর পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে এই হার সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৬৩ শতাংশ নারী রয়েছেন, যা ওই সব দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের, বিশেষ করে শ্রমবাজারের মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।




 জাহাঙ্গীর শাহ
সুত্রঃ প্রথম আলো, বংলাদেশ।

Thursday, March 6, 2014

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর ভূমিকাঃ কতটা এগিয়েছি আমরা

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর ভূমিকা যে কোনো দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অর্থনীতিতে কখনই তাদের কাজের মূল্যায়ন সঠিকভাবে করা হয়নি এবং অর্থনৈতিক তত্ত্বগুলোতে অনেক ক্ষেত্রে নারীর অ-আর্থিক কাজগুলোকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে ধরা হয়। যদিও নারীর ক্ষমতায়ন ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব এখন অনেকাংশে জাতীয় নীতিতে মূল্যায়ন পাচ্ছে তথাপি তার অগ্রগতি সামান্য। একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে নারীর অবদানকে উপেক্ষা করে একটি টেকসই অর্থনৈতিক অবকাঠামো কখনই চিন্তা করা যায় না। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতেও নারীর অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি ও তাদের ক্ষমতায়ন দেশের উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। এ দেশের নারীরা শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ করছে, উচ্চশিক্ষা লাভ করে পেশাগত সাফল্য লাভ করছে, জাতীয় উৎপাদন বাড়াতে সহায়তা করছে, পারিবারিক আয় ও কল্যাণ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। বিশ্বের দরবারে তৈরি পোশাক শিল্প আর ক্ষুদ্র ঋণের সাফল্যের মাধ্যমে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে। শুধু এ ক্ষেত্রেই নয়, অর্থনীতির অন্যান্য খাতেও নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপের সারণি-১ থেকে প্রতীয়মান হয়, বাংলাদেশের শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ ক্রমে বেড়ে চলেছে। সারণি-২ থেকে আরও স্পষ্ট হয়, কোন কোন খাতে নারীর অংশগ্রহণ কত।

সারণি-১-এ শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ ২০১০ সালে মোট শ্রমশক্তি ছিল ৫৬.৭ মিলিয়ন (৫৪.১ শতাংশ)। পুরুষের সংখ্যা ছিল ৩৯.৫ মিলিয়ন (৩৭.৯ শতাংশ)। নারীর সংখ্যা ছিল ১৭.২ মিলিয়ন (১৬,২ শতাংশ)। শহরে মোট শ্রমশক্তি ছিল ১৩.৩ মিলিয়ন (১২.৪ শতাংশ)। পুরুষের সংখ্যা ছিল ৯.৩ মিলিয়ন (৮.৮ শতাংশ), নারীর সংখ্যা ছিল ৪.৯ মিলিয়ন (৩.৬ শতাংশ)। গ্রামে মোট শ্রমশক্তি ছিল ৪৩.৪ মিলিয়ন (৪১.৭ শতাংশ)। পুরুষের সংখ্যা ছিল ৩০.২ মিলিয়ন (২৯.১ শতাংশ), নারীর অংশগ্রহণ ছিল ১৩.৩ মিলিয়ন (২.৬ শতাংশ)। 
সারণি-২ :অর্থনীতির মূল মূল খাতে নারীর অংশগ্রহণ (শতাংশ হিসাবে)  
কৃষি খাতে পুরুষের অংশগ্রহণ ৪০.৫১ শতাংশ, নারীর অংশগ্রহণ ৫৩.২ শতাংশ। ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে পুরুষের অংশগ্রহণ ১২.৫৯ শতাংশ, নারীর অংশগ্রহণ ১৬.৯৬ শতাংশ। খুচরা ব্যবসায় পুরুষ ১৬.৫৪ শতাংশ, নারী ৫.৪৩ শতাংশ। যোগাযোগ খাতে পুরুষ ১০.৭৪ শতাংশ, নারী ০.৪ শতাংশ। ব্যাংক ও ইন্স্যুরেন্সে পুরুষ ১.২২ শতাংশ, নারী ১.৩৭ শতাংশ। জনপ্রশাসন ও ডিফেন্সে পুরুষ ২.১৮ শতাংশ, নারী ১.০২ শতাংশ। শিক্ষা-বিনোদনে পুরুষ ৩.২১ শতাংশ, নারী ৪.৭ শতাংশ। কমিউনিটি ও সেবা খাতে পুরুষের অংশগ্রহণ ৪.১৩ শতাংশ এবং নারীর অংশগ্রহণ ১০.৭৮ শতাংশ।

সূত্রঃ ২০১০ সালের শ্রমশক্তি জরিপ, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। 

উল্লেখ্য, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধানতম ক্ষেত্র গার্মেন্ট শিল্পে ৮০ ভাগ কর্মীই নারী। দেশের ৯০ শতাংশ ক্ষুদ্রঋণ গ্রহণকারীও নারী। অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাতের এক গবেষণায় জানা যায়, নারী বিনা পারিশ্রমিক ও কম পারিশ্রমিকে যে পরিমাণ শ্রম দান করে, তা টাকার অঙ্কে জিডিপির শতকরা ৪৮ ভাগ। এই চিত্র নারীর অর্থনৈতিক অবদানের কথা উল্লেখ করে।

তবে আমাদের সন্তুষ্ট হলে চলবে না। কারণ, নারীর অর্থনৈতিক উন্নতি মানে দেশের সার্বিক উন্নতি। তাই উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলোতে এবং জাতীয় বাজেটে নারী উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত সম্পদের বরাদ্দ বাড়াতে হবে। জাতীয় বাজেটে যে প্রকল্পগুলো নারীদের জন্য রাখা হয় সেখানে তাকে শুধু দুস্থ ও বিত্তহীন নারী হিসেবে না দেখে উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে দেখা উচিত। নারী উন্নয়ন এবং তার ক্ষমতায়নের জন্য একদিকে যেমন দরকার সহযোগী নীতিমালা অন্যদিকে সেই নীতিমালাগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন জাতীয় বাজেটে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ। শ্রমবাজরে নারীদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে কয়েকটি বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। যেমন_ অনানুষ্ঠানিক খাতেই নারীদের অংশগ্রহণ বেশি। যার ফলে তাদের আয় কম এবং কাজের নিশ্চয়তাও কম। তা ছাড়া সরকারি চাকরিতে এখনও নারীর অংশগ্রহণ কম। মোট নিয়োজিত নারীর মাত্র ৩.২৫ শতাংশ সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত। আবার শ্রমবাজারে কর্মরত নারীদের অধিকাংশই খণ্ডকালীন কাজে নিয়োজিত। সুতরাং আনুষ্ঠানিক খাতেও আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে নারীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়াতে হবে। শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের জন্য নারীদের শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে হবে। শুধু শিক্ষার হার বাড়ালেই যথেষ্ট নয়। শিক্ষার গুণগতমান নিশ্চিত করতে হবে।

 


ড. ফাহমিদা খাতুন
লেখক :অর্থনীতিবিদ
তথ্যসুত্রঃ সমকাল

Sunday, March 2, 2014

ছয় নারী মুক্তিযোদ্ধা সম্মানিত

ছয় নারী। যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখ। চার দশকের বেশি সময় লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে, সামাজিক নিগ্রহ সয়ে জীবনটাকে বয়ে বেড়াচ্ছিলেন। কেউ জানতেও পারেননি বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে এঁরা জীবন বাজি রেখেছেন। তাঁরা সবাই মুক্তিযোদ্ধা। গতকাল শনিবার প্রথম আলো কার্যালয়ে এই ছয় নারী মুক্তিযোদ্ধাকে সংবর্ধনা দেওয়া হলো। মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী, নিজ নিজ ক্ষেত্রে উজ্জ্বল নারীরা দেশের আনাচকানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নারী মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে বের করে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানালেন। কেন এঁরা লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিলেন, কেন স্বীকৃতির জন্য এতটা কাল অপেক্ষা করতে হলো, সেই ভাবনা থেকে চোখ মুছলেন দেশের বরেণ্য ব্যক্তিরা।
 
স্বাধীনতার মাসের প্রথম দিনে এবং আন্তর্জাতিক নারী দিবসের ঠিক এক সপ্তাহ আগে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানিত করা হলো। প্রথম আলোর ফিচার সম্পাদক সুমনা শারমীনের উপস্থাপনা, অদিতি মহসিনের গান এবং সংবর্ধিত নারী আর সুধীজনদের কথায় অনুষ্ঠানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ছয় মুক্তিযোদ্ধা হলেন: পুষ্পরানী শুল্কবৈদ্য, মালতী রানী শুল্কবৈদ্য, হীরামনি সাঁওতাল, ফারিজা খাতুন, সাবিত্রী নায়েক ও রাজিয়া খাতুন। চেতনা ৭১ হবিগঞ্জের মহাসচিব কেয়া চৌধুরীর সাত বছরের চেষ্টায় গত বছরের ৯ ডিসেম্বর এই মুক্তিযোদ্ধারা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পান। এঁদের কেউ সম্মুখসমরে অংশ নিয়েছেন, কেউ সন্তানসহ সেনা ক্যাম্পে অবরুদ্ধ ছিলেন দিনের পর দিন এবং কেউ বোমার আঘাতে অঙ্গ হারিয়েছেন।
 
বোমার আঘাতে পা হারানো ফারিজা খাতুনকে কৃত্রিম পা লাগানোয় সহযোগিতা করেছে প্রথম আলো। এ জন্য খরচ হয়েছে ৫০ হাজার টাকা। এর বাইরে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে আরও ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয় ফারিজা খাতুনকে। অন্য পাঁচজনের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়া হয়। কৃত্রিম পা পেয়ে ভীষণ খুশি ফারিজা খাতুন। তিনি বলেন, ‘আমার বাবা ভিখারির মতন। কত ঘাটে গেছে। কত চেষ্টা করছে। এখন আমি হাঁটিয়ে বেড়াই। আমি খুবই খুশি।’ রণাঙ্গনের অধিনায়ক কে এম সফিউল্লাহকে কাছ থেকে দেখেই চিনে ফেলেন রাজিয়া খাতুন। পাকিস্তানি বাহিনীর হাত থেকে পালিয়ে সম্মুখসমরে অংশ নেন তিনি। এ ছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে অস্ত্র পৌঁছে দিয়েছেন এবং গুপ্তচরের কাজ করেছেন অসম সাহসিকতায়।
 
অনুষ্ঠানে এস ফোর্সের অধিনায়ক কে এম সফিউল্লাহ বলেন, ‘আজও মা-বোনদের স্বীকৃতি দেওয়ার মতো মনমানসিকতা হয়নি আমাদের। এই রাজিয়া আমার ক্যাম্পের শিক্ষার্থী ছিল। মা-বোনেরা মুক্তিযুদ্ধের সময় থাকার জায়গা দিয়েছেন, কোথায়-কখন পাক বাহিনী আসবে, তার খবর এনে দিয়েছেন। তাঁদের স্বীকৃতি যত দিন না আমরা দেব, তত দিন আমাদের কাজ শেষ হবে না।’ মানবাধিকারকর্মী হামিদা হোসেন তাঁদের খুঁজে বের করার জন্য ধন্যবাদ জানান কেয়া চৌধুরীকে।
 
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, ‘তেলিয়াপাড়ায় রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম হয়েছিল। এই ছয় নারী মুক্তিযোদ্ধা সেখান থেকে খুব দূরে ছিলেন না। অথচ তাঁদের খুঁজে বের করা যায়নি। এই ব্যর্থতা আমাদের।’ কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন বলেন, এই ছয় নারী মুক্তিযোদ্ধা বাঙালির অস্তিত্ব, পরিচিতি, স্বাধীনতা। নারীনেত্রী আয়শা খানম বলেন, বিভিন্ন এলাকায় যাঁরা সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, তাঁদের খুঁজে বের করে স্বীকৃতি দিতে হবে। এ কাজ সরকারের একার নয়। সেন্ট্রাল উইমেনস ইউনিভার্সিটির উপাচার্য পারভীন হাসান বলেন, সিরাজগঞ্জে এমন ২১ জন নারী আছেন, তাঁদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের আনাচকানাচে এমন আরও নারী আছেন। তাঁদের স্বীকৃতি দিতে হবে। ছয় নারী মুক্তিযোদ্ধার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান সাবেক সাংসদ সারাহ বেগম কবরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক আমেনা মহসীন, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সালমা আলী ও প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান।
 
এই ছয় নারী মুক্তিযোদ্ধাকে খুঁজে বের করা এবং তাঁদের মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করাটা যে সহজ কাজ ছিল না, তা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন কেয়া চৌধুরী। তিনি এ কাজ শুরু করেন ২০০৭ সালে। অনেক বাধা, অনেক কষ্ট ও চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তিনি সফল হন ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে। এভাবে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে বের করে স্বীকৃতি আদায় বা সরকারি গেজেটভুক্ত করার ঘটনা এটাই প্রথম বলে জানান কেয়া চৌধুরী। এ কাজে যাঁরা সহায়তা করেছেন, তিনি তাঁদের ধন্যবাদ এবং প্রথম আলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
 
ছয় নারী মুক্তিযোদ্ধাকে চেক ও উপহার তুলে দেন মেজর জেনারেল (অব.) কে এম সফিউল্লাহ, মেজর জেনারেল (অব.) আজিজুর রহমান, বিমানবাহিনীর ক্যাপ্টেন (অব.) সাহাবুদ্দিন আহমেদ বীর উত্তম, বিমানবাহিনীর ক্যাপ্টেন (অব.) আকরাম আহমেদ বীর উত্তম, লে. কর্নেল (অব.) এস আই নূরুন্নবী খান বীর বিক্রম, মেজর জেনারেল (অব.) জামিল ডি আহসান বীর প্রতীক। উপস্থিত ছিলেন মেজর (অব.) ওয়াকার হাসান বীর প্রতীক। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফল নারীদের মধ্যে ছিলেন অধ্যাপক মালেকা বেগম, শাহীন আনাম, মেহতাব খানম, তাজিন আহমেদ, শামসুন্নাহার, বিটপি দাশগুপ্ত, মিনু হক, আলিয়া নাহিদ, ফারাহ কবীর, তানিয়া হক প্রমুখ।






তথ্যসুত্রঃ প্রথম আলো, বংলাদেশ।

Sunday, January 19, 2014

১০০ নারী সম্মেলন - সমতার লড়াই

রুবানা হক
সমাজের বিভিন্ন উন্নয়নে অবদান রাখা বিশ্বের ১০০ জন নারীর উপস্থিতিতে ২৫ অক্টোবর বিবিসি আয়োজন করেছিল একটি সম্মেলন। নাম: ১০০ নারী সম্মেলন। আমাদের দেশ থেকেও উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ে সফলতার স্বাক্ষর রাখা মোহাম্মদী গ্রুপের রুবানা হক অংশ নিয়েছিলেন। গত শতাব্দী থেকেই নারীরা তাঁদের অসাধারণ সব অর্জনের মাধ্যমে অনেকখানি এগিয়ে গেছেন। তবু সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনীতির ক্ষেত্রে অবদানের জন্য যে শক্ত পদক্ষেপ নারীকে নিতে হচ্ছে, সেখানে জেন্ডার-বৈষম্যের কারণেই পুরুষদের তুলনায় তাঁদের প্রতিবন্ধকতা বেশি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। যেসব বিষয় আলোচনায় এসেছিল তার মধ্যে—

১। শিক্ষায় মেয়েশিশুর ঝরে পড়া ও বাল্যবিবাহ কি উন্নয়নের অন্তরায়?
২। রাজনীতি ও ব্যবসায়ে নারী কি আরও বেশি ভূমিকা রাখবেন?
৩। মাতৃত্ব ও পারিবারিক বন্ধনই কি নারীর অগ্রযাত্রায় বাধা?
৪। নারীবাদের ভূমিকার কি এখনো প্রয়োজন আছে?
৫। ধর্ম কি নারীর ক্ষমতায়নের পথে প্রতিবন্ধক?
৬। নারীর ঝুঁকি ও সম্ভাবনা
৭। যৌন সন্ত্রাস
৮। একক মাতৃত্ব
৯। নারীকে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা ইত্যাদি।

নিজ নিজ বিশেষায়িত অবস্থান থেকে সবাই অভিজ্ঞতা বিনিময়সহ তাঁদের দাবি ও প্রত্যাশার কথা ব্যক্ত করলেন। সিয়েরা লিওনের জায়নাব বাঙ্গুরার উত্থাপিত বিষয়টি আমাদের দেশের সামাজিক অবস্থাকেও সমানভাবে ইঙ্গিত করে। তিনি বললেন, তাঁর বয়স যখন ১২ বছর, তখন তাঁর বাবা তাঁকে বিয়ে দিতে চান। তাঁর মা এর প্রতিবাদ করলে বাবা তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেন সারা জীবনের মতো। জায়নাবের গ্রামের মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার অধিকার ছিল না। বাল্যবিবাহ সে দেশের মেয়েদেরও নিয়তি। আমাদের দেশেও এর ব্যত্যয় নেই।
 
মেয়েশিশু শিক্ষার হার বাড়লেও মেয়েদের উচ্চশিক্ষার হার সে অনুপাতে বাড়েনি। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে মেয়েশিশু শিক্ষার (অনূর্ধ্ব-৭ বছর) হার ছিল শতকরা ৫৪ দশমিক ৮ ও ছেলেশিশুর ৬১ দশমিক ১২। এটা আবার গ্রাম ও শহরের হারে বিশাল ফারাক। ২০০১ সালের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া মোট শিক্ষার্থীর ২৪ দশমিক ৩ ভাগ মেয়ে ও ৭৫ দশমিক ৭ ভাগ ছেলে। তো বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, আমাদের মেয়েশিশুদের উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত উত্তরণে পদে পদে অনেক বাধা। 

জায়নাব বলছিলেন, তাঁদের গ্রামের মেয়েশিশুরা স্কুলে যাওয়ার পথে আক্রমণের শিকার হয়। আমাদের দেশে ইদানীং ইভ টিজিং বেড়ে যাওয়ার কারণে অভিভাবকেরা মেয়েদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে বাল্যবিবাহ দিতে বাধ্য হচ্ছেন। সেদিন আমাদের একটি টিভি চ্যানেলেও উত্তরাঞ্চলের কিছু মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মেয়েদের সঙ্গে কথোপকথন প্রচার করা হচ্ছিল, যেখানে ১৬ বছরের কম বয়সী ছাত্রীদের অনেকেরই বিয়ে হয়ে গেছে। কেন? মেয়েরা বলছিল, বিয়ে হয়ে গেলে স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে ছেলেরা আর উত্ত্যক্ত করে না, তাই। কিন্তু তাদের কেউই এ বয়সে বিয়ে হোক, তা চায়নি। তারা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে আগ্রহী। তারা আরও বলছিল, তাদের লেখাপড়ায় বেশি দূর এগোনোর সুযোগ নেই। কারণ, তাদের শ্বশুরবাড়ির কেউ চান না, ঘরসংসার বাদ দিয়ে তারা লেখাপড়া করুক। এ মেয়েগুলোর মুখে ছিল না কোনো উচ্ছ্বাসের ঝলক, ছিল না কিশোরীর চপলতা। আনন্দহীনতা আর অনিশ্চয়তার কালো ছায়ায় ভরা ছিল তাদের নির্লিপ্ত চোখ।

ইউএনএফপিএর এক তথ্য অনুযায়ী, ‘বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ রোধে নানা ধরনের উদ্যোগ থাকলেও এখনো গড়ে শতকরা ৬৬ ভাগ নারীকে ১৮ বছরের আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হচ্ছে’। ইউএনএফপিএর বাংলাদেশ প্রতিনিধি আর্থার আরকেন বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশেই বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি। ধর্মীয় গোঁড়ামি, সম্পত্তিতে অনগ্রাধিকার, পরের ঘরে যাওয়ার নিয়তি, অনিরাপত্তা, অধস্তনতা, পুরুষের সঙ্গে অসমকক্ষতা ইত্যাদি বাল্যবিবাহের পূর্বশর্ত হিসেবে মেয়েদের উচ্চশিক্ষার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। জায়নাব বাঙ্গুরা বলছিলেন, একজন নারী সত্যিকার শিক্ষিত হলে প্রথমে তিনি তাঁর পরিবারকে রক্ষা করবেন এবং তারপর রাজনীতিতে এলে দেশকেও রক্ষা করতে পারবেন। জায়নাব আরও বলছিলেন, তাঁর মা লিখতে ও পড়তে জানেন না। কিন্তু তিনি বলেন, শিক্ষা হচ্ছে সোনার চাবি, যা দিয়ে পৃথিবীর সব সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেওয়া যায়।

 

 উম্মে মুসলিমা: কথাসাহিত্যিক।
 সূত্রঃ প্রথম আলো, বাংলাদেশ।

 
Our Another Site : Right Way BD | Right Way BD FB Group | Right Way BD FB Page |